বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বর্তমান বিশ্ব ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।

Author

মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪৪ বার

বর্তমান যুগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার-প্রচারনার যুগ। এই সময়ের মূল ভিত্তিই হলো প্রযুক্তি বিপ্লব। বিশেষ করে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স উদ্ভাবনের পর থেকে এই প্রযুক্তি বিপ্লব আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে। শিক্ষা, গবেষণা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে রাতারাতি এক বিশাল পরিবর্তন ও বিপ্লবের সূচনা ঘটেছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বর্তমানে খুব সহজেই নানা সফটওয়্যার তৈরি ও ডেভেলপ করা খুব সহজেই সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া গবেষণা ক্ষেত্রে নৃত্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডাটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে খুব সহজে তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে এআই ব্যবহার করে এই কাজ খুব দ্রুত ও বিশুদ্ধভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। যার ফলে বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির দক্ষলেই বলা চলে। কমিউনিকেশন, লেনদেন, কেনাবেচা, শিক্ষা গবেষণা সব ক্ষেত্রেই যেন বর্তমানে শুধু প্রযুক্তিরই জয়ধ্বনি। এজন্য বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ প্রযুক্তিগত ভাবে উন্নত হওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত।এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই তাদের শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পরিধি ও প্রয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বেকারত্ব হ্রাস করতে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো থেকে প্রায়োগিক দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রযুক্তির এই যুগেও মান্ধাতার আমলের মতোই রয়ে গেছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেক অংশেই খাতা কলম নির্ভর। এখনো আমাদের দেশের শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শুধু গ্যাদা গ্যাদা বই আর নোট পড়ানো হয়। প্রায়োগিক শিক্ষা এখনো এখানে গ্ৰহণযোগ্যতা পাইনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের চেষ্টা করা হলেও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বহির্বিশ্ব থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

‎তাছাড়া বহির্বিশ্বে যেখানে শিক্ষা ও গবেষণাধর্মী কাজগুলোর উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে যথোপযুক্ত ফান্ডের অভাবে থমকে আছে গবেষণা। ফান্ডগুলো বরাদ্দ হচ্ছে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্র আসলে সার্বিক বিবেচনায় বহির্বিশ্ব থেকে অনেক পিছিয়ে। আরো হতাশার জায়গা হলো আমাদের উচ্চ শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নেই পর্যাপ্ত বই ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা। বিভাগগুলোতে নেই শিক্ষার্থী অনুপাতে ডিজিটাল ল্যাব রুম কিংবা গবেষণা উপকরণ। ফলে ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীরা বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে পড়ালেখা বা জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যেতে পারছে না।

‎তাছাড়া আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিম্নমুখী ও গবেষণা খাত দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আমাদের দেশের চাকরির বাজার। আমাদের দেশে বেশি ভাগ সরকারি চাকরি বা হাই প্রোফাইল চাকরির ক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রশ্ন হয় তাত্ত্বিক। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দক্ষতা অর্জন থেকে তাত্ত্বিক জ্ঞান আয়ত্তে আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মূলত এদেশের বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত । এজন্য দিনশেষে সবার কাছেই ভালো চাকরি পাওয়াটাই আসলে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। তাই তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আয়ত্তে আনাটাই শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ ও নিরাপদ বলে মনে হয়। আর যার ফলে দেখা যায় দেশে সরকারি বেসরকারি ভাবে ইন্জিনিয়ার নিয়োগ হলেও দিনশেষে বড় বড় কাজগুলো বাইরের দেশের ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী দিয়ে করাতে হয়, দেশে হাজার হাজার ডাক্তার থাকলেও জটিল অপারেশন গুলো বাইরের দেশের ডাক্তার সম্পূর্ণ করে।

‎কিছু ক্ষেত্রে আবার দেখা যায় দক্ষ শিক্ষার্থীরা যথোপযুক্ত প্লাটফর্ম কিংবা সুযোগের অভাবে বাইরের দেশে পাড়ি জমায়। ফলে দেশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেধাবী হারায়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সম্প্রতি সময়ে প্রতি বছর দেশ থেকে ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমান যাদের অধিকাংশই পরবর্তীতে আর দেশে ফিরে আসেন না। ফলে দেশ হারিয়ে ফেলে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। যার একটা বিরূপ প্রভাব রয়ে যায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি থেকে সকল ক্ষেত্রে। যদিও বাইরের দেশে বসবাসরত এসব নাগরিকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিটেন্স দেশকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব মেধাবীরা দেশে থাকলে দেশ বিনির্মাণ সহজ হতো, দেশের অর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা সহজ হতো।

‎আবার আমরা যদি বহির্বিশ্বের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের অতিরিক্ত পড়ালেখার পেশার না দিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হয়। খেলাধুলা, অঙ্কন, বিজ্ঞান , গণিত এসব বিষয়ে প্রতি শিশুদের ছোট থেকেই আগ্ৰহী করে গড়ে তুলা হয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি একেবারে শিশু শ্রেণী থেকে নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলা এবং সামাজিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশের দিকেও বিশেষ খেয়াল করা হয়। ফলে তাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি হয় খুবই মজবুত ও দৃঢ়।

‎কিন্তু আমরা যদি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যায় আমাদের দেশের শিশুরা ছোট থেকেই বেড়ে ওঠে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে। মুখস্থ ও বই নির্ভর এই শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিশু অকৃতকার্য হলে সমাজ ও সহপাঠীদের চোখে হীন হয়ে বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে এদেশে সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকায় অধিকাংশের কাছেই সাফল্যের মাপকাঠি হয় তথাকথিত পড়ালেখা করে ভালো রেজাল্ট করা। যার ফলে অনেক সৃজনশীল ও বুদ্ধিমান শিশুও ছোট থেকে আত্মহীনমনতায় ভুগে। আবার যে তথাকথিত শিক্ষা শিশুদের দেওয়া হয় অধিকাংশ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেটুকুও যত্ন সহকারে পাড়ানো হয় না । ফলে ছোট থেকেই এদেশের অধিকাংশ শিশুই সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় ।

‎তাছাড়া উন্নত দেশগুলোতে যেখানে শিক্ষার্থী অনুপাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় আমাদের দেশে সেখানে বহু শিক্ষার্থীদের জন্য খুব কম সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ পান। ফলে শিক্ষকদের ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও সক্ষমতা অনুযায়ী পড়ানো বা শিক্ষাদান করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ( বিশেষ করে গ্ৰাম অঞ্চলগুলোতে ) দেখা যায় দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হতে। যার ফলে অযোগ্যরা শিক্ষক হন এবং সুশিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়।

‎আর প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুরাবস্থার কারণে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার মান বর্তমান বিশ্ব থেকে অনেক পিছিয়ে। বিশ্ব যখন নৃত্য নতুন আবিস্কার , আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেসিন লার্নিং এর মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত তখন আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা এগুলোর আবিষ্কারকের নাম কিংবা থিওরি পড়তে পড়তে ক্লান্ত। যার ফলে বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ভিত্তিক নানা কর্মসংস্থান তৈরি হলেও আমাদের দেশের তরুণরা সেখানে গ্ৰহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। আবার শত শত এ প্লাস, হাই সিজিধারি শিক্ষার্থী থাকলেও হাতে গোনা গবেষক , লেখক ও বিজ্ঞানী। এবছর Global Innovation Index (GII) এ ১৩৯ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬ তম। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ৩৮ তম এবং শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৯৩ তম। যা আসলেই অনেক হতাশার বিষয়। এই অবস্থান ও সূচক আসলে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুরাবস্থার পরিস্থিতি চোখের সামনে তুলে ধরে। তুলে ধরে এদেশের গবেষণা খাতের করুন পরিস্থিতি।

‎এজন্য সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। তাত্ত্বিক বিষয়গুলো কমিয়ে এনে প্রায়োগিক ও কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার প্রয়োজন। প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও প্রসারের, প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষকের। পাশাপাশি  শিক্ষাঙ্গন গুলোকে সম্পূর্ণরূপে দূর্নীতি মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য একযোগে সরকার ও এদেশের শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আমাদের জন্য সত্যিই কঠিন হয়ে যাবে। দেশ অর্থ সামাজিক ও অবকাঠামোগত ভাবেও পিছিয়ে পরবে। সুশিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীদের নীতি, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস হবে। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে। এজন্য বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিকায়ন জরুরি।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!