বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিশুর সুস্থ বিকাশে সচেতনতা।

Author

মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪২ বার

প্রতিটি শিশুই এক একটি ফুল। তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে অগাধ সম্ভবনার উন্মুক্ত দার।  কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়নের এই প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে নানা কৃত্রিম কারণে বাঁধা গ্রস্থ হচ্ছে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ। বদ্ধ পরিবেশ, মোবাইল ফোনের নেশা , পিতা-মাতার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলেছে তাদের বুদ্ধিদীপ্ত অগ্ৰগতী।যার ফলে‌ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে। এজন্য শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশ যাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবে ঘটে তার প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে।নিশ্চিত করতে সুস্থ বিনোদন‌ , পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদেরকে প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে রাখতে হবে এবং যথোপযুক্ত প্যারেন্টিং এর মাধ্যমে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুনিশ্চিত করতে হবে। তবেই জাতি একটি দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম উপহার পাবে।

একটা সময় ছিল যখন শিশুরা বেড়ে উঠতো পরিবারের মাঝে সুস্থ সুন্দর পরিবেশে। দাদি কিংবা নানির কোলে আদর-যত্ন আহ্লাদে। তখন হাজারো খুনসুটি, হৈ-হুল্লোড় আর হাসিতে অতিবাহিত হতো তাদের দিন। প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকায় প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে গড়ে উঠতো তাদের নিবিড় সখ্যতা। তখন গ্ৰামের মাঠে প্রান্তরে বিভিন্ন গ্রামীণ খেলাধুলা, সাঁতার, দৌড়াদৌড়ি সহ বিভিন্ন দুরন্তপনায় হাসি তামাশায় কেটে যেতো শিশুদের দিন। যার ফলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হতো দ্রুত ও স্বভাবিক। শহরেও তখনো তেমন একক পরিবার গড়ে না উঠায় এবং খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় শিশুদের বিকাশও ছিল স্বাভাবিক ও প্রাণোচ্ছল।

‎‎কিন্তু সেইসব দিন বদলে গেছে। প্রযুক্তির আকাশ ছোঁয়া বিপ্লব, শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে খেলাধুলার বদলে শিশুদের বেড়েছে বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি। বেড়েছে অনলাইন গেমস এর নেশা, কার্টুন ও ভিডিওর প্রতি আকর্ষণ। খাবার সময় কিংবা অবসর সব সময়ই ফোন কিংবা ইলেকট্রনিক ডিভাইস তাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠেছে। যার প্রভাব পড়ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। থমকে যাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা। অনেক শিশুই বেড়ে উঠছে বিভিন্ন শারীরিক কিংবা মানসিক জটিলতা নিয়ে। কিছু শিশুর বুদ্ধির বিকাশ হচ্ছে ধীর গতিতে। কিছু শিশু হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বোধ ক্ষমতা।

‎বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটার পর শিশুরা একটু জ্বালাতন কিংবা দুষ্টমি করলে সহজে চুপ করানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হাতের কাছে থাকা মোবাইল ফোন। তাছাড়া যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে ছোট ছোট পরিবারে রূপ নেওয়ায় কমেছে শিশুদের পরিবারিক বিনোদন ও আনন্দের জায়গা যা মোবাইলের প্রতি আসক্তি জন্মানোর অন্যতম কারণ। তার উপর কিছু পরিবারে বাবা, মা দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় শহরের বেশির ভাগ শিশুই বেড়ে উঠছে কাজের মাসী কিংবা আয়ার কাছে যারা একটু আরাম করতে কিংবা অলসতার কারণে শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছে মোবাইল ফোন যা তাদের মানসিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

‎পরিসংখ্যান ভিত্তিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে শিশুদের স্ক্রিন টাইম ২ ঘন্টার বেশি হলে তাদের ভাষা ও মানসিক বিকাশ ধীর গতিতে হয়। তাছাড়া উক্ত গবেষণায় দেখা গেছে স্ক্রিন টাইম বেশি হলে শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কর্টেক্স পাতলা হয়ে যায়। যা শিশুর স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ ক্ষমতা ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে ফেলে। তাছাড়া শিশুদের মোবাইলে স্ক্রিন টাইম বেশি হলে মোবাইল থেকে বের হওয়া নীল আলো মেলাটোনিন নামক হরমোন কমিয়ে ফেলে যা ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে শিশুদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং বাইরের জগৎ থেকে আগ্ৰহ হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ তৈরি হয় অবিবেচক মানুষ, মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রজন্ম।

‎কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের সমাজ বাস্তবতায় পিতা-মাতা নিজেরাই অনেক সময় মোবাইলে আসক্ত হওয়ায় তারা সন্তানকেও ডুবিয়ে রাখে মোবাইল গেমস কিংবা ভিডিওতে। তাছাড়া  অনেক সময় দেখা যায় চাকরিজীবী পিতা-মাতা তাদের কাজের প্রতি এতোটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের সাথে ঠিক মতো কথাই বলেন না। ফলে শিশুরা বেড়ে উঠে একাকিত্বে যা তাদেরকে মোবাইলে আসক্ত হতে বাধ্য করে। তৈরি হয় পিতা-মাতা থেকে সন্তানের দুরত্ব। কখনো কখনো দেখা যায় বড় হয়ে এসব শিশুরা অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। মানসিক বিকারগ্রস্থ অবস্থা তাদেরকে ঠেলে দেয় হত্যাকান্ড ও অপরাধ প্রবণতার দিকে। সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনাবোধও কাজ করে না। তাছাড়া অতিরিক্ত মোবাইলে সংযুক্ত থাকার কারণে অনেক শিশু কিশোর জড়িয়ে পড়ে কিশোর গ্যাং কিংবা মাদক ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে; যা নষ্ট করে তাদের কৈশোর ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।

‎এজন্য আগামীতে একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রজন্ম তৈরির জন্য মজবুত করতে হবে শিশুদের শৈশবের ভিত। যথোপযুক্ত প্যারেন্টিং এর মাধ্যমে পারিবারিক মূল্যবোধের মধ্যে বড় করতে হবে শিশুকে। শিশুকে শান্ত করতে মোবাইলের পরিবর্তে তুলে দিতে হবে বিভিন্ন খেলনা অথবা বই। সেই সাথে বড় হলে বইয়ের প্রতি আগ্ৰহ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে শিশুদের, যেন তারা বিবেচক ও চিন্তাশীল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি উৎসাহ দিতে হবে। কাজের পাশাপাশি পিতা-মাতাকে অবশ্যই শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মাঝে মাঝে ঘুরতে যাওয়া, বিনোদনের ব্যবস্থা করা এগুলোর মাধ্যমে শিশুদের চিত্তবিনোদন নিশ্চিত করতে হবে, তবেই তাদের মাঝে মোবাইল আসক্তি ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।

‎এছাড়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে তাদের হাতে মোবাইল নয় বরং তাদের সময় দিন। ভালোবাসা, মায়া, মমতা দিয়ে আলোকিত করুন  তাদের জীবন। তবেই তৈরি হবে সুস্থ স্বাভাবিক বিবেকবোধ সম্পন্ন সৃষ্টিশীল মানুষ। যারা হবে আগামীর ভবিষ্যৎ, জাতির সুযোগ্য কর্ণধার।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!