বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্ক্রিনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বই

Author

জারির ইবনে কামাল , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ১২৭ বার

একটি বই কখনো কখনো একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। একটি ভালো বই একজন মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে তাকাতে শেখায়। আর হাজারো বইয়ের সম্মিলিত ঠিকানাই হলো পাঠাগার। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই সময়ে যখন তথ্যের প্রাচুর্য অভূতপূর্ব, তখন পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবা জরুরি। কারণ তথ্য আমাদের অবহিত করে, কিন্তু গভীর পাঠ আমাদের চিন্তাশীল করে তোলে।

​মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ নেই। অজানাকে জানা, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা এবং চিন্তার পরিধি বিস্তৃত করার অনন্য সুযোগ লুকিয়ে আছে বইয়ের পাতায়। প্রতিটি বই যেন এক একটি নতুন পৃথিবী—যেখানে অপেক্ষা করে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, কল্পনা, দর্শন ও অজস্র সম্ভাবনা। আর এই বিচিত্র জগতের দরজা খুলে দেওয়ার নীরব চাবিকাঠি হলো পাঠাগার।

​সুশিক্ষা ও প্রকৃত জ্ঞানার্জনের জন্য মুক্তবুদ্ধির চর্চা অপরিহার্য। বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না; যুক্তি দিয়ে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, গল্প-উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধ—প্রতিটি বই মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করে, দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। একটি পাঠাগার তাই কেবল বই রাখার জায়গা নয়; এটি মানুষের চিন্তা ও বিবেক গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

​একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাযাত্রাকে সহজ করে দেয়। এখানে সে পাঠ্যবইয়ের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। পাঠাগারের তাক থেকে একটি বই হাতে নেওয়া মানে কখনো ইতিহাসের কোনো অধ্যায়ে প্রবেশ করা, কখনো দূরদেশের মানুষের জীবন জানা, কখনো নিজের অজানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। পাঠাগার যেন সিন্দাবাদের সেই রণতরী, যার পাল ধরে একজন সাধারণ পাঠকও পৌঁছে যেতে পারে জ্ঞানের অচেনা ভূখণ্ডে।

​একজন পাঠকের যাত্রা শুরু হয় কৌতূহল দিয়ে। প্রথমে সে হয়তো একটি বই হাতে নেয়, কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে, তারপর আরেকটি বই। ধীরে ধীরে তৈরি হয় পড়ার অভ্যাস, তৈরি হয় নিজস্ব আগ্রহ ও চিন্তার পথ। একসময় বই হয়ে ওঠে তার নীরব শিক্ষক। এইভাবেই পাঠাগার একজন মানুষকে শুধু শিক্ষিত করে না; তাকে সচেতন, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

​কিন্তু এই জায়গাতেই বর্তমান সময়ের একটি বড় উদ্বেগ সামনে আসে। ডিজিটাল যুগে তরুণদের একটি বড় অংশ ক্রমেই বই ও পাঠাগার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্মার্টফোনের পর্দায় অসংখ্য তথ্য ও বিনোদন হাতের নাগালে থাকলেও গভীরভাবে পড়ার অভ্যাস ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত বদলে যাওয়া ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়ার ধৈর্য অনেকের মধ্যেই কমে যাচ্ছে।

​সমস্যাটি শুধু পাঠাগারে না যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গভীর পাঠের অভ্যাস কমে গেলে চিন্তার গভীরতা, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং কোনো বিষয়কে বিশ্লেষণ করার প্রবণতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি প্রজন্ম যদি তথ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়, কিন্তু সেই তথ্য নিয়ে ভাবতে ও বিশ্লেষণ করতে অভ্যস্ত না হয়, তবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

​তবে এর সমাধান প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং প্রযুক্তিকে পাঠাভ্যাসের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা। আধুনিক পাঠাগারে ছাপা বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, ডিজিটাল আর্কাইভ ও অনলাইন জার্নালের সুযোগ থাকতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বইপাঠ কর্মসূচি, পাঠচক্র, বই আলোচনা, লেখক-পাঠক সংলাপ এবং পাঠ-প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। পাঠাগারকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা না বানিয়ে তরুণদের চিন্তা, আলোচনা ও সৃজনশীলতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

​এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোরদের হাতে ছোটবেলা থেকেই বই তুলে দিতে হবে। তাদের পড়া বই নিয়ে কথা বলতে হবে, পছন্দের বই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। একই সঙ্গে পাঠাগারকে হতে হবে আকর্ষণীয়, পরিচ্ছন্ন ও তরুণবান্ধব। শুধু বইয়ের তাক সাজিয়ে রাখলেই পাঠাগার কার্যকর হয় না; সেখানে পাঠক তৈরির পরিবেশও তৈরি করতে হয়।

​রাষ্ট্রেরও এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব কম নয়। শহরের পাশাপাশি উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও আধুনিক গণপাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। পুরোনো ও অপ্রতুল পাঠাগারগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বই সংগ্রহ, প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক নিয়োগ এবং ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি দেশের জ্ঞানচর্চার সুযোগ কেবল রাজধানী বা বড় শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেবারিক।

​সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজে পাঠাভ্যাস সমৃদ্ধ, সেখানে চিন্তা, গবেষণা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার বিকাশও বেশি। জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় না; প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম, যারা পড়তে জানে, ভাবতে জানে এবং প্রশ্ন করতে জানে। সেই প্রজন্ম তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো পাঠাগার।

​পাঠাগার তাই নিছক বই রাখার স্থান নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা, চিন্তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্ঞানচর্চার সুবর্ণ ভূমি। একটি পাঠাগারের নীরব পরিবেশে হয়তো আজ একজন তরুণ বই পড়ছে; কিন্তু সেই পাঠই আগামী দিনের একজন গবেষক, শিক্ষক, লেখক, বিজ্ঞানী কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির সূচনা হতে পারে।

​আজ আমরা যদি আমাদের তরুণদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিই, আগামীকাল শুধু পাঠক নয়, চিন্তাশীল নাগরিকও হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই পাঠাগারে বিনিয়োগ মানে শুধু বই কেনা নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা, বিবেক ও ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।

​শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু তথ্য জানবে, নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা তথ্যকে জ্ঞানে এবং জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপান্তর করতে পারবে? উত্তরটি নির্ধারণ করবে আমাদের আগামী দিনের সমাজ কেমন হবে।

​“আলোকিত মানুষেরা পাঠকের সাজে,

পৃথিবী বাঁচুক বইয়ের ভাঁজে।”

​লেখক:

জারির ইবনে কামাল

সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।