বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সীরাত পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত

Author

জারির ইবনে কামাল , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৬৬ বার

মানবজীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে প্রয়োজন এক নির্ভুল নির্দেশনার, যা মানুষকে পথ দেখাবে অন্ধকারে, জোগাবে এগিয়ে চলার প্রেরণা। পৃথিবীতে যুগে যুগে বহু মনীষীর আগমন ঘটেছে, কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবনচরিত বা সীরাত সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অনন্য ও কালজয়ী আলোকবর্তিকা। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা হয়। অথচ একটি সুন্দর, পরিশীলিত ও মানবিক সমাজ গঠনে সীরাত পাঠ কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়; বরং অপরিহার্য।

​পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

​“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

​সীরাত অধ্যয়ন কেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হওয়া উচিত, তার যৌক্তিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মানবজীবনের প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সীরাত পাঠের ফজিলতগুলো হলো:

​১. বহিরাঙ্গের পরিপাট্য ও অন্তর্জগতের আলো

মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ— উভয় রূপের সমন্বয়ে। সীরাত আমাদের শেখায় কীভাবে পরিপাটি ও রুচিশীল জীবনযাপন করতে হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন:

​“পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)

​তাঁর পোশাক পরিধান, সুগন্ধির ব্যবহার এবং পরিপাটি থাকার সুন্নাহ আমাদের বহিরাঙ্গের পরিপাট্য নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যই নয়, সীরাত আমাদের অন্তর্জগতকে আলোকিত করার পথ দেখায়। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন:

​“আমি তোমাদের উপর যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক বা রিয়া।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)

​অহংকার, হিংসা, লোভ ও রিয়া তথা লৌকিকতা থেকে মুক্ত হয়ে কীভাবে একটি প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হওয়া যায়, সীরাত পাঠে সেই আধ্যাত্মিক মহিমার স্ফুরণ ঘটে।

​২. শিষ্টতাপূর্ণ আচরণ ও ভাষার মাধুর্য

বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বড় সংকট হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শিষ্টাচারের অভাব। সীরাত পাঠ আমাদের আচার-আচরণকে করে তোলে বিনয়ী ও শিষ্টতাপূর্ণ। রাসূল (সা.) বলেছেন:

​“ছোটদের স্নেহ করো, বড়দের সম্মান করো।” (সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)

​এ সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিশুদ্ধভাষী ও সদালাপী। তাঁর প্রতিটি কথা ছিল স্পষ্ট, অর্থবহ এবং মাধুর্যে ভরপুর। কখনো কারও সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলেননি। তাঁর মাঝে ছিল সত্যবাদিতা, সাহসিকতা, কোমলতা, দৃঢ়তা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা, কল্যাণকামিতা, বদান্যতা, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, স্নেহ-মমতা, পরমত সহিষ্ণুতা, আত্মসচেতনতা, আল্লাহর প্রতি পরম আস্থা, আপন কাজে নিষ্ঠা ও অবিচলতা, ন্যায়ের প্রতি আনুকূল্য, অন্যায়ের প্রতি বজ্র-কাঠিন্য, অটুট মনোবল, নিঃস্বার্থ ত্যাগ-তিতিক্ষা। মোদ্দাকথা, উন্নত চরিত্রের সকল উপাদান।

​এছাড়াও মজলিসে কীভাবে বসতে হবে, আগন্তুককে কীভাবে বিদায় জানাতে হয়, আগন্তুককে কীভাবে সম্বোধন করতে হবে, অতিথিকে কীভাবে বিদায় জানাতে হয়, পথচারী আপনার কাছে কী ব্যবহার চায়, সাথী-সঙ্গী ও ছোট-বড় ভেদে আচরণের কী তারতম্য হওয়া দরকার, ইশারা-ইঙ্গিতের প্রয়োগ কেমন হওয়া চাই, প্রশ্ন ও উত্তরের ধরণ কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই মহানবী (সা.)-এর জীবনীগ্রন্থ পাঠ করতে হবে।

​৩. চরিত্রের ভারসাম্য ও পেশাগত উৎকর্ষ

মানবচরিত্রের এক বিস্ময়কর দিক হলো ভারসাম্য, যা ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। সীরাত আমাদের চরিত্রের ভারসাম্য সৃষ্টিতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। রাগ-অনুরাগ, হাসি-কান্না, কঠোরতা-কোমলতা— সবকিছুর এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল রাসূল (সা.)-এর জীবনে। তিনি যেমন ছিলেন রণক্লান্ত সেনাপতি, তেমনি ছিলেন শিশুদের সাথে খুনসুটিতে মেতে ওঠা এক মমতাময়ী পিতা।

​ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সময়ানুবর্তিতা এবং সহকর্মীদের প্রতি সুবিচার— পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা যেকোনো যুগের যেকোনো পেশাজীবীর জন্য এক চূড়ান্ত গাইডলাইন। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তাদেরকেও সুন্দর ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর ভাষা হত সুস্পষ্ট, বাহুল্যবর্জিত ও সহজবোধ্য। তাঁর মধুর ভাষণ শ্রোতাকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করত। চরম বিদ্বিষ্ট ব্যক্তি পর্যন্ত তার বচন শুনে চমৎকৃত হত। ভাষার রুঢ়তা তিনি পছন্দ করতেন না। গালমন্দ ও অশ্লীলতা তার ভাষায় ঠাঁই পেত না। একদিকে তাঁর স্নিগ্ধ ভাষা হতদরিদ্র বেদুঈন বৃদ্ধার হৃদয় সঞ্জীবিত করত, অন্যদিকে তার শাণিত তেজস্বী বাক্যে দুর্দান্ত আরব্য সর্দারের অন্তরাত্মা প্রকম্পিত হত।

​মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিতের এ অধ্যায় নিঃসন্দেহে তার আগ্রহী পাঠককে উন্নত ও মহৎ চরিত্রের পথনির্দেশ করে এবং কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে তার অনুশীলনে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং, নিজের ভেতর উন্নত চরিত্রের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে প্রতিটি মানুষের জন্য সীরাত পাঠের বিকল্প নেই।

​৪. দায়িত্বসচেতনতা ও আস্থার অবিচলতা

​“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।”

​রাসূল (সা.)-এর এই অমর বাণী আমাদের চরম দায়িত্বসচেতন হতে শেখায়। একজন নাগরিক, পরিবারের কর্তা কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার—সবার জন্যই সীরাতে রয়েছে দায়িত্ব পালনের সুস্পষ্ট রূপরেখা। তাই সফল জীবনের প্রত্যাশীকে সীরাত পাঠে মনোযোগী হতে হবে।

​৫. শোক ও দুঃখে পরম সান্ত্বনা

মানুষের জীবনে শোক ও দুঃখ এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রিয়জন হারানো বা জাগতিক ব্যর্থতায় যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন সীরাত পাঠ হতে পারে সবচেয়ে বড় মানসিক প্রলেপ। রাসূল (সা.) তাঁর জীবনে পিতা-মাতা, প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তান এবং অসংখ্য প্রিয় সাহাবীকে হারিয়েছেন। অবর্ণনীয় শোকের মুহূর্তেও তিনি কীভাবে ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকেছেন, তা শোকে-দুঃখে মূহ্যমান যেকোনো মানুষের জন্য পরম সান্ত্বনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর পাথেয় হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ তাআলার সর্বপ্রিয় হাবীবকে যখন দুঃখ পোহাতে হয়েছে, তখন আপনাকে আমাকেও পোহাতে হবে বৈকি। এটা আমাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

​কুরআন মাজীদের ভাষায়:

​‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তার জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহযাব: ২১)

​সীরাত কোনো সাধারণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নয়; এটি জীবনের এক জীবন্ত ক্যানভাস। আমাদের ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন, পারিবারিক প্রশান্তি এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা—সবকিছুর নিখুঁত সমাধান লুকিয়ে আছে এই পবিত্র জীবনচরিতে। আসুন, আমরা সীরাত পড়ি, অনুধাবন করি এবং ব্যক্তিজীবনে তার প্রতিফলন ঘটাই। কারণ, আলোকিত জীবন ও একটি মানবিক বিশ্ব গড়তে সীরাতের চেয়ে বড় কোনো পাঠ্যসূচি এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।

​লেখক:

জারির ইবনে কামাল

সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।