শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নদীর আয়নায় চরজীবন, দিগন্তে তুরা পাহাড়

Author

মাসফিকুল হাসান , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১০৩ বার

সকালটা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কুড়িগ্রামের চিলমারী নদীবন্দরের দিকে এগোতেই চোখে পড়ল বিস্তৃত নদী। দূরে নৌকা, কাছে নদীর ঢেউ। কোথাও জেলেদের ব্যস্ততা, কোথাও চরজুড়ে সবুজের বিস্তার। শহুরে ব্যস্ততার বাইরে এসে মনে হলো, বাংলাদেশের আরেকটি মুখ যেন চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে।বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের নিয়ে আমাদের এবারের যাত্রার গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারী। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে যাত্রাপথটিই যেন হয়ে উঠেছিল এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় গল্প।

 

চিলমারী থেকে নৌকায় দীর্ঘ পথ। নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলেছে। কখনো দুই পাড় কাছাকাছি, আবার কখনো চোখ যতদূর যায় শুধু পানি আর পানি। নদীর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। কোথাও চর জেগে উঠেছে, কোথাও নদীর কিনারা ভেঙে পড়েছে। আর এই পুরো যাত্রার মধ্যে বারবার মনে হচ্ছিল—বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে হবে না, নদীর বুকেও যেতে হবে।

 

চিলমারীর নামের সঙ্গে নদী ও নৌযাত্রার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখান থেকে নৌকায় যাত্রা শুরু করার পর শহুরে পরিচিত দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে থাকে।নৌকা যত সামনে এগোয়, ততই চারপাশের বিস্তৃতি বাড়তে থাকে। নদীর পানি কখনো শান্ত, কখনো ঢেউ খেলানো। বাতাস এসে মুখে লাগছে। নৌকার ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের মধ্যেও তখন অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। সংবাদ সংগ্রহের কাজে যাঁরা প্রতিদিন ক্যামেরার লেন্সে নানা দৃশ্য ধরে রাখেন, তাঁদের জন্যও এই যাত্রা ছিল একটু আলাদা।এখানে কোনো সংবাদ সম্মেলন নেই, কোনো ব্যস্ত সড়ক নেই, নেই পরিচিত ক্যাম্পাসের কোলাহল। আছে শুধু নদী আর নদী।

 

নৌকায় বসে নদীকে একভাবে দেখা যায় না। নদীর সঙ্গে সময় কাটাতে হয়।কিছুক্ষণ পর পরই বদলে যায় দৃশ্য। কখনো দেখা যায় ছোট নৌকা নিয়ে কেউ নদী পার হচ্ছেন। কোথাও জাল ফেলেছেন জেলে। কোথাও নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে গবাদিপশু। আবার কোথাও দূর থেকে দেখা যায় চরের মধ্যে ছোট ছোট ঘর। নদী এখানে শুধু প্রকৃতি নয় মানুষের জীবনযাত্রারও বড় অংশ। বাংলাদেশের নদীভিত্তিক জনপদে মানুষের জীবিকা, যোগাযোগ, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নদীর সম্পর্ক বহু পুরোনো। নদী কখনো জীবনের পথ তৈরি করে, আবার কখনো সেই নদীই ভাঙনের মাধ্যমে মানুষের ঘর কেড়ে নেয়। নৌকায় বসে এই দুই বাস্তবতাই যেন একসঙ্গে দেখা যাচ্ছিল। একদিকে নদীর সৌন্দর্য, অন্যদিকে নদীকে ঘিরে মানুষের সংগ্রাম।

 

নৌযাত্রার সবচেয়ে মন ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলোর একটি ছিল নদীর চর। দূর থেকে চরগুলোকে মনে হয় সবুজের ছোট ছোট দ্বীপ। কোথাও কৃষিকাজ চলছে, কোথাও ঘরবাড়ি। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায়, কেউ নিজের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত।শহর থেকে দেখলে চর যেন শুধু একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। কিন্তু চরবাসীর কাছে এটি জীবন ও সংগ্রামের জায়গা। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ে। আবার পানি কমলে জেগে ওঠা জমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। নদীর গতিপথ বদলালে বদলে যায় মানুষের বসতিও। একটি চর তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার নাম। নৌকা যখন চরগুলোর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল—এই মানুষগুলোর জীবন আমাদের শহুরে জীবনের চেয়ে কত আলাদা। অথচ তাদেরও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা আছে। পার্থক্য শুধু জীবনযাপনের ধরনে।

 

নদীকে দূর থেকে যতটা সুন্দর মনে হয়, নদীর কাছে থাকা মানুষের কাছে তার আরেকটি কঠিন রূপও আছে। চরের মানুষ নদীভাঙনের সঙ্গে পরিচিত। একবার নদী ভাঙলে শুধু একটি বাড়ি হারায় না; হারিয়ে যেতে পারে একটি পরিবারের বহু বছরের স্মৃতি, জমি, গাছপালা, প্রতিবেশী—কখনো পুরো একটি বসতি। আজ যে জায়গায় চর, কয়েক বছর পর সেখানে হয়তো নদী। আবার অন্য কোথাও নতুন চর জেগে উঠতে পারে। নদীর এই পরিবর্তনশীল চরিত্রই নদীপাড়ের মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। নৌকা থেকে তাকিয়ে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে তাই বারবার মনে হচ্ছিল—এই সৌন্দর্যের পেছনেও কত মানুষের গল্প লুকিয়ে আছে।

 

যাত্রার একপর্যায়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল।দূরে আবছা নীলচে রেখার মতো দেখা যাচ্ছিল পাহাড়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা পাহাড়ের বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণি বাংলাদেশের এই উত্তরাঞ্চল থেকেও অনেক জায়গা থেকে দৃশ্যমান হয়। নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, চর আর তার ওপারে দূরের পাহাড়—দৃশ্যটি যেন হঠাৎ বদলে দিল পুরো পরিবেশ। এতক্ষণ পর্যন্ত সামনে ছিল নদী ও চর। এবার সেই দৃশ্যপটে যুক্ত হলো পাহাড়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তঘেঁষা ভূপ্রকৃতির সৌন্দর্যের বিশেষত্ব এখানেই—একদিকে নদী, অন্যদিকে চর, আর দিগন্তের ওপারে ভারতের পাহাড়। নৌকার সবাই তখন নিজেদের মতো করে সেই দৃশ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কেউ মোবাইল হাতে, কেউ ক্যামেরা নিয়ে। সাংবাদিকদের চোখে হয়তো প্রতিটি দৃশ্যই একটি সম্ভাব্য গল্প। কিন্তু কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা গেলেও তার সৌন্দর্য পুরোপুরি ছবিতে আটকে রাখা যায় না। তুরা পাহাড়ের সেই দূরদৃশ্যও ছিল তেমনই।

 

এই যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল প্রকৃতির বৈচিত্র্য।একই পথের মধ্যে নদীর বিস্তৃতি, চরের জীবন এবং দূরের পাহাড়—তিনটি আলাদা ভূদৃশ্যকে একসঙ্গে দেখা গেছে। কখনো মনে হয়েছে আমরা নদীর মাঝখানে ভাসছি। কিছুক্ষণ পর মনে হয়েছে চর আমাদের খুব কাছে। আবার একটু পর দিগন্তে চোখ রাখলেই পাহাড়ের রেখা। প্রকৃতি এখানে যেন কোনো শিল্পীর মতো নিজের ক্যানভাস বদলে বদলে আঁকছিল। নৌকার ওপর বসে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের নিজেদের মধ্যেও কথাবার্তা চলছিল। ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা, সাংবাদিকতার নানা অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুর মাঝেই বারবার ফিরে আসছিল প্রকৃতির কথা। একটি ভ্রমণ কখনো কখনো মানুষকে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। এই যাত্রাও তেমনই।

 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের কাছে এই সফর শুধু বিনোদনের জন্য বেরিয়ে পড়া কোনো ভ্রমণ ছিল না। সাংবাদিকতার ব্যস্ততার বাইরে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করারও সুযোগ ছিল এটি। সারাবছর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কখনো শিক্ষার্থীদের দাবি, কখনো কোনো অনুষ্ঠান কিংবা সমস্যা—প্রতিদিনই সংবাদ সংগ্রহের ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে এসে নদীর বুকে কয়েক ঘণ্টা কাটানো ছিল অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ক্যামেরা ছিল, কিন্তু কোনো সংবাদ সম্মেলন কাভার করার জন্য নয়। নোটবুক ছিল, কিন্তু কোনো বক্তব্য লেখার জন্য নয়। চোখ ছিল, তবে এবার খবর খোঁজার পাশাপাশি সৌন্দর্য দেখার জন্যও। সাংবাদিকতার বাইরের এই সময়টুকুই হয়তো আমাদের নিজেদের আরও কাছাকাছি এনেছে।

 

শহুরে জীবনে আমরা অনেক সময় প্রকৃতিকে দেখি মোবাইলের পর্দায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাহাড়ের ছবি দেখি, নদীর ভিডিও দেখি, চরের সৌন্দর্য দেখি। কিন্তু নদীর ওপর দাঁড়িয়ে বাতাস অনুভব করা আর পর্দায় নদীর ভিডিও দেখা এক নয়।নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশের বিস্তৃতি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার জন্য খুব দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদেই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অচেনা সৌন্দর্য। শুধু প্রয়োজন সেই সৌন্দর্য দেখার চোখ।

 

চিলমারী থেকে রৌমারীর দীর্ঘ নৌযাত্রা কখন শেষ হয়ে এলো, অনেকটা সময় বুঝতেই পারিনি। কারণ পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি চর, নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন আলাদা গল্প বলছিল।কোথাও নদীর নীরবতা, কোথাও মানুষের ব্যস্ততা। কোথাও সবুজ চর, কোথাও নদীর বিশালতা। আর সবকিছুর ওপরে দূরের পাহাড়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও মনে হচ্ছিল, এই যাত্রার আসল সৌন্দর্য হয়তো গন্তব্যে নয় বরং পথেই ছিল।

 

ভ্রমণ শেষে ফিরে আসার পরও চিলমারী থেকে রৌমারীর সেই নদীপথের দৃশ্যগুলো বারবার মনে পড়ছিল। সাংবাদিক হিসেবে আমরা প্রতিদিন মানুষের গল্প লিখি। কিন্তু সেই দিনের নদী আমাদের যেন অন্য একটি গল্প শুনিয়েছে—নদীর গল্প, চরের মানুষের গল্প, প্রকৃতির গল্প এবং সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের গল্প। বাংলাদেশকে শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বড় শহরের চোখ দিয়ে দেখলে এই দেশের একটি বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়। দেশের আসল বৈচিত্র্য বুঝতে হলে কখনো নদীর কাছে যেতে হয়, কখনো চরে যেতে হয়, কখনো সীমান্তের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখতে হয়। চিলমারী থেকে রৌমারীর সেই নৌযাত্রা আমাদের জন্য তাই শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবনকে কাছ থেকে দেখার একটি সুযোগ। নদীর ঢেউ আমাদের সঙ্গে চলেছে। চর তার মানুষের গল্প শুনিয়েছে। আর দূরের তুরা পাহাড় নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে পুরো যাত্রার সাক্ষী হয়ে। দিন শেষে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছেছে। আমরা ফিরে এসেছি নিজেদের পরিচিত জীবনে। আবার ক্যাম্পাস, ক্লাস, সংবাদ সংগ্রহ, ব্যস্ততা—সব শুরু হয়েছে। তবু কোথাও যেন রয়ে গেছে সেই নদী, রয়ে গেছে চরের সবুজ,রয়ে গেছে নৌকার দুলুনি। আর দিগন্তের ওপারে দেখা সেই নীলচে পাহাড়—যা কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও আমাদের মনকে শহুরে ব্যস্ততা থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল প্রকৃতির আরও কাছে। হয়তো এ কারণেই ভ্রমণ শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া নয়। কখনো কখনো ভ্রমণ নিজের পরিচিত পৃথিবীর বাইরে গিয়ে নতুন করে দেশকে আবিষ্কার করার নাম। চিলমারী থেকে রৌমারীর সেই দীর্ঘ নৌপথে আমরা যেন বাংলাদেশকেই একটু নতুন করে আবিষ্কার করে ফিরেছি।

 

মাসফিকুল হাসান 

শিক্ষার্থী ও লেখক 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর 

লেখক: সহ সাংগঠনিক সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে শেয়ারবিজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।