কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস: স্বস্তির আড়ালে সংকট ও উত্তরণের রূপরেখা।
বাংলাদেশের ট্রেন যাত্রা সব সময় সাধারণ মানুষের জন্য আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী একটি পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম কিংবা দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াতে ট্রেনের উপর নির্ভরশীলতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।কিশোরগঞ্জ জেলা সহ পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের রাজধানীতে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস। কিশোরগঞ্জের সর্বমোট ৩ টি ট্রেন রয়েছে। এই ট্রেন গুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস আরামদায়ক হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে যাত্রীদের জন্য এই ট্রেন যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ কিন্তু সেই অনুযায়ী বাড়েনি রেল সেবার মান। প্রায় সময় পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে সাধারণ যাত্রীদের দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। অনেক তরুণ যুবক বিপদ জনক ভাবে ট্রেনের ছাদে উঠে থাকে, অনেক সময় ট্রেনের ছাদে উঠতে গিয়ে অনেকে হাতে-পায়ে ব্যাথা পায়। আবার রেল লাইনের পাশে বিভিন্ন গাছপালা থাকার কারণে অনেকেই মাথায় আঘাত পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটি দূর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না হতে পারে। বিশেষত বিমান বন্দর রেল স্টেশনে অনেকে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যাত্রী ছাউনীর উপর দিয়ে, কাঁটা তারের বেড়া ডিঙিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠতে দেখা যায়। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অনিরাপদ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, কিশোরগঞ্জের জনগণের জন্য যে ট্রেন আছে তা সংখ্যায় নগণ্য এবং জনগণের চাহিদার তুলনায় কোচের পরিমাণ অপ্রতুল। ফলাফল স্বরূপ, চরম আসন সংকট এবং অতিরিক্ত ভিড় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ফলে অনেকে ট্রেনের টিকিট ক্রয় করার পরও নির্ধারিত সময়ে সঠিক আসনে পৌঁছাতে পারে না। কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস অনেক সময় রাত ৮ টার সময় পৌঁছানোর কথা থাকলেও রাত ১০ টা বাজে । অনেক সময় আসনগুলোতে ময়লা-আবর্জনা জমে চারপাশে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রায় সময় ট্রেনের টয়লেটগুলো অত্যন্ত অপরিষ্কার থাকে । এছাড়াও অচল লাইট-ফ্যান, ভাঙ্গা জানালা,এবং মোবাইল চার্জ করার মতো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও ট্রেনের যাত্রীরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন । ট্রেনে যাত্রা শুরু করার পর একের পর এক ফেরিওয়ালা ট্রেনে উঠছে-অনিয়ন্ত্রিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, ভিক্ষুক, ও ফেরিওয়ালা। কেউ হাতে আমড়া, চানাচুর-ঝালমুড়ি, পেয়ারা, চিপস ও বিস্কুট ইত্যাদি পণ্য সামগ্রী। অনেকেই আবার শিশুদের খেলনাও বিক্রি করছে লোকজনের কাছে। শিশুরা খুব মজা করে খেয়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব খাবার জীবনের জন্য কতটা নিরাপদ? যাত্রাপথে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরেও অনেকের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ সহ গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস চুরি হয়ে যাচ্ছে?। কিছু ধান্দাবাজ যাত্রাপথে মানুষের সব কিছু লোট-পাট করে নিয়ে যায়। অনেকের জীবনের শেষ সম্বলটুকু চুরি হয়ে যাওয়ায় একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই প্রতারণার শেষ কোথায়? মানুষের জীবনটা হয়ে যাচ্ছে মারাত্মক ঝাকিপূর্ণ, এসবের দায় কার? সম্প্রতি হকার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করছে যা দেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যাত্রাপথে দেখা যায় ট্রেনে ১০-১২ জন পর্যন্ত হকারী করে। এতে যাত্রীরা বিরক্ত বোধ করে। অনেকে আবার ট্রেনের গেটে দাঁড়িয়েও হকারী করছে বিভিন্ন সামগ্রী- এতে যাত্রীদের টেনে উঠতে অনেক কষ্টকর হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক ও নিরাপদ যাতায়াতের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটার ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে। প্রায় সময় কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না ছাড়া এবং একই পথে চলা ট্রেনকে ক্রসিং দেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার । অনেক সময় এই ট্রেন নির্ধারিত স্টেশন ছাড়াও অপেক্ষা করে অন্য ট্রেনকে ক্রস করার সুযোগ দেয়। ফলে প্রায় সময় যাত্রীদের চরম বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট থেকে উত্তরণে করণীয় কি? এই সংকট সমাধানে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত,যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী পুরাতন বগির পরিবর্তে নতুন বগি সংযোজন ও বগির সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনীয় ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে ট্রেন স্টেশন থেকে ছেড়ে যেতে হবে এবং যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। তৃতীয়ত, রেললাইনের পাশে বড় ধরনের গাছপালা চেটে অথবা কেটে ফেলতে হবে। চতুর্থত, ট্রেনের ছাদে যেন কোন ভাবেই যাত্রী উঠতে না পারে সেদিকে রেলওয়ে পুলিশকে সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রাখতে হবে। পঞ্চমত, পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ করতে হবে। ষষ্ঠত, অচল লাইট-ফ্যান ও ভাঙ্গা জানালা সংস্কার এবং মোবাইল চার্জ করার মতো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অষ্টমত, হকার বা ফেরিওয়ালা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না কারণ অনেকেই এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। হকারি অনেকের আবার একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন তাই তাদের দিকেও নজর রাখতে হবে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট একটা বিধিমালা প্রণয়ন করার প্রয়োজন। চলন্ত ট্রেনে হকারি করতে হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত হতে হবে। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া ট্রেনে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, হকার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ট্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তারা মনে করেন, যাত্রীবাহী বগিতে হকার মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত বিক্রেতাদের জন্য আলাদা বগি নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কার্ড বা নাম্বার থাকতে হবে। বিকল্প উপায় হিসেবে হকারদের জন্য প্রতিটা স্টেশনে নির্দিষ্ট স্থান দেওয়া যেতে পারে। এতে ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি অনেকাংশে কমে যাবে। যাত্রীদের মতে, সাশ্রয়ী ভাড়া তারা চাই, কিন্তু অস্বস্তিকর যাত্রা নয়। রেলপথে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে হকারদের অবাধ চলাচল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ ট্রেনের যাত্রীরা কেবল বিলাসবহুল সেবা আশা করছে না, বরং একটি নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও পরিচ্ছন্ন যাত্রীবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা চাই। কিশোরগঞ্জের যাত্রীদের মানসম্মত রেল সেবা নিশ্চিত করা উপেক্ষিত বিষয় নয়, বরং এটা তাদের প্রাপ্য অধিকার। সর্বোপরি, প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিঃদ্রঃ: এই কলাম টা দৈনিক আমার বার্তা ও বাংলাবাজার পত্রিকায় ২০/১০/২৬ ইং তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।
মোঃ শরীফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।
