বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবার হোক মা-বাবার নিরাপদ আশ্রয়স্থল

‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কান্নাজড়িত মায়ের মুখ, আরো ভেসে ওঠে বাবার দুর্বল সেই চাহনি। এ যেন জীবনের একটা অভিশাপ। সারাজীবন নিজের সন্তানদের বড় করে তুলে শেষ জীবনে সন্তানকে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টায় কি তবে অন্যায়?
বর্তমানে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি এ দেশে মহামারি হিসেবে ধরা না দিলেও দিন দিন এর গতানুগতিকভাব বেড়েই চলেছে। জলে ভেজা মায়ের প্রিয় মুখখানি যখন চোখের সামনে ধরা দেয়, তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলি কখনো মাকে চোখের জল ফেলতে দেব না। আঁকড়ে ধরে থাকব সারাজীবন। দশ মাস দশ দিন যেমন কষ্ট করে আমাদের ধারণ করেছিলেন, সে ঋণ তো কখনোই শোধ হওয়ার নয়। তার সঙ্গে তো আছেই আমাদের বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত মেনে নেওয়া সব আবদার। আমাদের একটু অসুখ হলেই নিজে না ঘুমিয়ে আমাদের জন্য সারা রাত জেগে থাকে, ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে আমাদের জন্য সবকিছু সাজিয়ে রাখা, আমরা না খাওয়া পর্যন্ত না খেয়ে থাকা- এসব বুঝি সত্যিই মায়েরাই পারে। মায়েদের কথা লিখলেও শেষ হওয়ার নয়।
বাবা সে তো বটগাছের ছায়ার মতো এতটা আগলে রাখে। আমাদের চলার পথে সব সমস্যার সমাধান করে থাকে। নিজে সারাজীবন কষ্ট করে যায় সন্তানের সুখের আশায়, তাদের হাসি-খুশি রাখার নেশায়। যত আবদার তার কাছে পূরণ করার রাস্তা। তাদের আমরা দূরে ঠেলে দিতে পারিনা, একদমই না। সন্তানকে যেমন মা-বাবা অতি আদরে আগলে রেখেছিল তেমনি মা-বাবাকেও আগলে রাখার, যত্নে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক সন্তানের।
প্রকৃতির নিয়মে এই ভাবনায় মানুষ জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। পড়ালেখা শেষ করে সে স্বাবলম্বী হয়। তারপর বিয়ে করে সংসার হয়। এর মাঝে বাবা-মায়েরও বয়স বাড়তে থাকে, কমতে থাকে শরীরের শক্তি, অবলম্বন হয়ে পড়ে সন্তানের। সংসারের হাল ধরে সবার দায়িত্ব নেয় সন্তানেরা। কিন্তু কীসের খেয়ালে অতীতের সব স্মৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে সন্তানদের। চিন্তায় তখন নতুন আত্মীয় স্বজন। ঘরের মাঝে জায়গা পায় পশুপাখিও। কিন্তু বড় বড় ফ্ল্যাটে জায়গার কমতি পড়ে মা বাবার জন্য। এক সময়ের অবলম্বন সময়ের খেয়ালে বোঝা হয়ে পড়ে সন্তানের কাছে মা-বাবা। অবশেষে বাবা-মায়ের ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় বৃদ্ধাশ্রম।
জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ একদিন এক অনুষ্ঠানে দুঃখভরা কণ্ঠে বলছিলেন ‘ভাবিনি কখনো বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম কথাটা শুনতে হবে।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বড্ড বেশি কানে আসছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ কথাটি।
এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক- পৃথিবীতে প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। গৃহছাড়া অবহেলিত ও অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিল শান রাজবংশ। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য এই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। প্রাচীন চীনে শান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা বর্তমান বিশ্বে প্রসার লাভ করে। এখন আসা যাক বাংলাদেশে- বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা প্রবর্তন হয় ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের হাত ধরে। বার্ধক্য সবার জন্য শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও স্বস্তিময় জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ। সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবন এবং পরে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ও হোম ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দেশব্যাপী এ প্রতিষ্ঠানটির ৫০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, ব্র্যাক, প্রবীণ অধিকার ফোরাম প্রভৃতি প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে। এসব সংস্থা মূলত বৃদ্ধ বয়সে যারা সহায়-সম্বল হীন হয়ে পড়ে, তাদেরকে নিয়ে কাজ পরিচালনা করে।
বর্তমানে প্রেক্ষাপটে, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৯১ সালে দাঁড়ায় ৬০ লাখ। ২০১০ সালের পর ১ কোটি ২৫ লাখের বেশিতে এসে দাঁড়ায় এ সংখ্যা। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ হবে প্রায়। এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য প্রয়োজন ধর্মীয় মূল্যবোধ, উপযুক্ত শিক্ষা, নৈতিকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতা। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ‘বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মায়ের নিরাপদ আবাসস্থল’। এক সুতায় বেঁধে পরিবারের সেই স্নেহ-ভালোবাসার অটুট বন্ধন, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
তবে, সব সময় যে সন্তানদের অবহেলার কারণেই বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয় তা কিন্তু নয়। অনেক সময় অনেক নিঃসন্তান বাবা-মা, যারা শেষ বয়সে কারো সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায়, তাদের জন্য কিন্তু বৃদ্ধাশ্রম এক আশ্রয়স্থল। সেই দিক ভাবলে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগকে ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের বাবা-মাকেও বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। আসুন সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমকে ‘না’ বলুন। যত্নে থাকুক প্রত্যেক মা-বাবা।

