থার্টি ফার্স্ট নাইট উচ্ছ্বাস উন্মাদনা নাকি আত্মসমালোচনার ক্ষণে সামাজিক দায়

থার্টিফার্স্ট নাইট উচ্ছ্বাস উন্মাদনা নাকি আত্মসমালোচনার ক্ষণে সামাজিক দায়।
বছরের শেষ রাত থার্টি ফার্স্ট নাইট। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হলেও এই রাতকে ঘিরে মানুষের আবেগ উচ্ছ্বাস আর প্রত্যাশার যেন শেষ নেই। পুরোনো বছরকে বিদায় জানানো আর নতুন বছরকে বরণ করার সন্ধিক্ষণে আজ শুধু সময়ের পরিবর্তন নয় হয়ে ওঠেছে এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতি। সংস্কৃতির অর্থ হলো- সংস্কার, উন্নয়ন, উত্তম বা উন্নতমানের চরিত্র গঠন, সংশোধন, পরিমার্জন, সৌন্দর্য প্রকাশ ইত্যাদি। অথচ রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের আকাশে রঙিন হয়ে ওঠে আতশবাজির আলোয়। যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় শুভেচ্ছা বার্তা ও পুরোনো স্মৃতি আর নতুন স্বপ্নের ঘোষণায়। এই রাতকে উদযাপন করতে বিভিন্ন দেশে নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালিত হয়। যেমন- আঙুর খাওয়া স্পেনের উৎসব, গায়ে পানি ছিটানো থাইল্যান্ডের উৎসব, সাদা পোশাক পরিধান করা ব্রাজিলদের উৎসব, শিক্ষকদের কাছে দীর্ঘায়ু কামনা ভিয়েতনামের উৎসব, এই রাতে না ঘুমানো কোরিয়াদের উৎসব এবং এক সাথে ভোজন করা আর্জেন্টিনাদের উৎসব। বাংলাদেশে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের লক্ষ্যে এমন সব অপসংস্কৃতির আয়োজন করা হয় যা তরুণ-তরুণীদের অপকর্মে প্রলুব্দ করা হয়। এই বিকৃত আনন্দকে গ্লামারাইজ করে তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মবিনাশের পথে। আসলে তা নৈতিক অবক্ষয়ের নগ্নপ্রদর্শনী। রাজধানীর বড় বড় শহরগুলোর অভিজাত ক্লাবগুলোসহ আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট, ছাদে বসে রাতভর অসামাজিক কার্যকলাপের সমাহার। রাস্তায় শুরু হয় বেপরোয়া মোটরসাইকেল, উচ্চস্বরে গান-বাজনা, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও আতঙ্কের মধ্যে পড়ে শিশু বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ। এটি এক নিয়ন্ত্রণহীন উন্মত্ততায় পরিণত হয়েছে। অথচ এই ভোগান্তির দায় কেউ নিতে চায় না। আরো উদ্বেগজনক হলো- এই রাতে মাদক ও অবাধ মদ্যপান ও অসামাজিক আচরণ যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে ফানুস ওড়ানো হয় দেখতে নিঃসন্দেহে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষাদময় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ফানুস ওড়ানোর ফলে প্রায় প্রতি বছর ঘটে যাচ্ছে অগ্নিকাণ্ড, ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির মত ঘটনা। সময়ের সঙ্গে ফানুসের উৎসব জনপ্রিয় হলেও এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায় না বললেই চলে। উজ্জ্বল কাগজে ঢাকা ছোট আগুনের উৎস ফানুস আকাশে ভেসে ওঠে ঠিক কোথায় গিয়ে পড়বে তার নির্দিষ্ট কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে অবহেলায় ওড়ানো এই ফানুস থেকে অগ্নিকাণ্ডের আবির্ভাব ঘটে নানারকম সমস্যা সৃষ্টি হয় যেমন- পাখি প্রজাপতিসহ প্রচুর কৃটপতঙ্গ মারা যায়, জমির ফসল হাড়ায় কৃষক, বসতঘর পুড়ে যায় এমনকি মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। ক্ষণিকের আনন্দের মূহুর্তে কালো অধ্যায় হয়ে ওঠে অনেক পরিবারে। এছাড়া ফানুসে ব্যবহৃত কাগজ, প্লাস্টিক ও ধাতব রিং রাস্তায় ও জলাশয়ে জমে পরিবেশ দূষণ করে। এই একটি রাতকে ঘিরে নগরজীবনে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয় তা এখন আর আনন্দ উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, মূল্যবোধ ও দ্বায়িত্ববোধের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একটি রাতই যেন সমাজ তার সংযম শালীনতা আর বিবেককে ইচ্ছাকৃতভাবে ছুটি দিয়ে দেয়। আনন্দের নামে যে চিত্তবিক্ষোভ তা কোনো সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। নোংরামি, অশ্লীতা, বেহায়াপনা ইত্যাদি অপকর্ম সংস্কৃতি নয়। থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন বর্তমানে ভোগবাদী সংস্কৃতির অনিবার্য অনুসঙ্গ। এই রাতকে কেন্দ্র করে অযথা খরচ অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণহীন আনন্দ উল্লাস যেন নৈস্বর্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কতটা জ্যাকজমকপূর্ণ আয়োজন করল, কে কত ব্যয় করল এসবের মধ্যেই যেন আনন্দের মানদণ্ড নির্ধারিত থাকে। অথচ এই উৎসবের পিছনে চাপা পরে যায় সংযম দ্বায়িত্ব ও সামাজিক সংবেদনশীলতার মত মৌলিক মূল্যবোধ। এই রাতে উচ্ছ্বাসের বিপরীত চিত্রও আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না। একদিকে অভিজাত এলাকায় আলোর ঝলকানি ও উৎসবের কোলাহল। অন্যদিকে শহরেই আরেক প্রান্তে দেশের একটি বড় অংশ এই রাতেও অনাহারে থাকে। উচ্ছ্বাসের শব্দে ঢেকে যায় ক্ষুধার্ত পেটের করুণ নিঃশ্বাস। আতশবাজির ঝলকানিতে ম্লান হয়ে যায় ধূলোমাখা চাদরে মোড়ানো সেই অসহায় মানুষদের নির্ঘুম রাত। তাদের কাছে থার্টি ফার্স্ট নাইট মানে আরেকটি ঠান্ডা অনিশ্চিত রাত। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো বছরের শেষ রাতটি আত্মসমালোচনার, দায়বদ্ধতার ও নতুন অঙ্গীকারের মূহুর্তের বিপরীতে বানিয়েছি দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স। তবে কি নতুন বছরকে স্বাগত জানানো অনুচিত- এমন কথা বলার সুযোগ নেই। নতুন বছর মানেই প্রত্যাশা প্রাপ্তি ও নতুন পণ, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু উদযাপন যদি হয় দ্বায়িত্বশীল, সংযত ও মানবিক তাহলে তা অর্থবহ হয়। থার্টিফার্স্ট নাইট হতে পারে আত্মসমীক্ষার রাত। আমরা কি পেলাম? কি হাড়ালাম? আমরা ব্যক্তি হিসেবে, সমাজের মানুষ হিসেবে কতটা মানবিক হলাম সেই হিসাব করা দরকার। নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হোক প্রার্থনায়, প্রতিজ্ঞায় ও আত্মসমালোচনায়। আলো হোক ভিতরের, শব্দ হোক বিবেককের। উদযাপন হোক কিন্তু তা হোক শালীন ও নিরাপদে। আনন্দ ছড়াক তবে কারও ক্ষতির বিনিময়ে নয়। বছরের শেষ রাত আমাদের শেখাক- আলো শুধু আকাশে নয় মনেও জ্বালাতে হয়। তাহলেই থার্টি ফার্স্ট নাইট সত্যিকারের অর্থে হয়ে উঠবে একটি সুন্দর বিদায় ও আশার আগমনের প্রতীক। থার্টি ফার্স্ট যেন আর কোনো মায়ের কোল শূন্য না করে, কোনো বাবার চোখ না ভেজায়, কোনো পরিবারের হাসি চিরতরে কেড়ে না নেয়। আনন্দ হোক সংযত, উৎসব হোক নিরাপদ, আর নতুন বছর হোক মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। তবেই থার্টি ফার্স্ট নাইট অবসাদ নয়- হবে আশার দ্বারপ্রান্ত।
লেখক পরিচিতি-
ফারনাজ মুক্তা
নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ
https://epaper.kholakagojbd.com/index.php?cd=2025/12/30

