বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

অচেনা ঠিকানায় হাসিমুখের ফেরিওয়ালা।

Author

শাহাদাত হোসেন রাহাত , সিদ্ধেশ্বরী কলেজ, ঢাকা

প্রকাশ: ৯ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২১৯ বার

ভোর তখন পুরোপুরি জাগেনি। শহরের রাস্তা ধীরে ধীরে চোখ মেলছে। চায়ের দোকানে প্রথম কাপে ধোঁয়া উঠছে, অফিসগামী মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছে দিনের লড়াইয়ের জন্য। ঠিক সেই সময়ই শহরের আরেকটি চাকা ঘুরতে শুরু করে – যারা আমাদের দরজায় দরজায় পৌঁছে দেয় প্রয়োজন, শখ, কখনও আনন্দও। তারা হলো ডেলিভারি ম্যান।

আমরা যখন মোবাইল হাতে নিয়ে অনলাইন শপিংয়ে অর্ডার নিশ্চিত করি, তখন মনে হয় কাজটা খুব সহজ। কয়েকটা ক্লিক, তারপর অপেক্ষা। কিন্তু সেই ক্লিকের পরই শুরু হয় আরেকটি অদৃশ্য যাত্রা। সেই যাত্রার চালক একজন মানুষ – যার নিজেরও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, ক্লান্তি আছে, কিন্তু সময়মতো পার্সেল পৌঁছানোই যার প্রথম দায়িত্ব।

মো: রফিক। বয়স ২৬। শহরের ছোট একটি ভাড়া বাসায় থাকেন মা ও ছোট বোনকে নিয়ে। সংসারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। ভোরে ঘুম ভাঙে অ্যালার্মে নয়, দায়িত্বের চিন্তায়। সকাল ৬টার মধ্যে উঠে পড়েন। অনেক দিন ঠিকমতো নাস্তা করা হয় না। কখনও তাড়াহুড়ায় এক কাপ চা আর দুইটা বিস্কুট খেয়েই বের হয়ে পড়তে হয়। কারণ ৭টার মধ্যে তাকে হাবে পৌঁছাতে হবে।

হাবে পৌঁছে শুরু হয় দিনের আসল কাজ। পার্সেল সাজানো, লোকেশন অনুযায়ী ভাগ করা, কোনটা আগে যাবে, কোনটা পরে – সবকিছু ঠিক করতে হয় খুব দ্রুত। ভুল করার সুযোগ খুব কম। কারণ একটি ভুল মানে শুধু গ্রাহকের অসন্তোষ নয়, কখনও বেতন কাটা, কখনও ইনসেন্টিভ কমে যাওয়া।

ডেলিভারি কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ট্রাফিক না – সময়, আবহাওয়া আর মানুষের প্রত্যাশা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় – সবকিছুর মাঝেই চালাতে হয় সাইকেল। অনেক সময় গ্রাহকের কাছে পৌঁছে শুনতে হয়, “এত দেরি কেন?” কিন্তু সেই দেরির পেছনের গল্পটা কেউ জানে না – রাস্তার জ্যাম, ভুল লোকেশন, হঠাৎ সাইকেলে সমস্যা, বা দুপুরের খাবার না খেয়ে টানা কাজ করা।

দুপুর মানে অনেকের জন্য বিশ্রাম, কিন্তু একজন ডেলিভারি ম্যানের জন্য সেটাই সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। অফিস পার্সেল, অনলাইন শপিং, জরুরি ডেলিভারি – সব একসাথে জমা হয়। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যেই অফিসে কর্মরত গ্রাহকের হাতে পার্সেল পৌঁছে দিতে হবে। এই সময়টাতে ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ একটি ভুল মানে শুধু কাস্টমারের অভিযোগ না, কখনও ইনসেন্টিভ কাটা, কখনও চাকরির ঝুঁকি। তবুও এই কাজের ভেতরে আছে ছোট ছোট আনন্দ। কখনও কেউ পানি দেয়, কেউ হাসিমুখে ধন্যবাদ দেয়, কেউ বলে “ভাই সাবধানে যান” – এই কথাগুলোই নতুন করে শক্তি দেয়।

সন্ধ্যার পর যখন শহর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনও অনেক ডেলিভারি ম্যান রাস্তায় থাকে। কারণ রাতের অর্ডার মানে বাড়তি ইনকাম। রাতের শিফটে আরেক ধরনের কাজ থাকে – পার্সেল পিকআপ। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ছোট অনলাইন দোকান, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পার্সেল সংগ্রহ করে হাবে পৌঁছে দিতে হয়। এই কাজ শেষ করতে করতে অনেক সময় রাত ১১টা বা তারও বেশি হয়ে যায়। তারপরও পরের দিনের জন্য আবার প্রস্তুতি নিতে হয়।

ডেলিভারি ম্যানদের জীবনে ছুটি খুব কম। উৎসবের সময় যখন সবাই আনন্দে ব্যস্ত, তখন তাদের কাজ আরও বেড়ে যায়। ঈদ, পূজা, নববর্ষ – সব সময়ই তাদের ওপর চাপ বেশি থাকে। কারণ মানুষ তখন বেশি কেনাকাটা করে। একজন ডেলিভারি ম্যান শুধু পণ্য পৌঁছে দেয় না। সে পৌঁছে দেয় সময়, বিশ্বাস আর দায়িত্ব। সে শহরের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সে ব্যবসা আর গ্রাহকের মাঝের একটি জীবন্ত সেতু। আমরা হয়তো তাদের নাম জানি না। অনেক সময় ধন্যবাদ বলতেও ভুলে যাই। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সুবিধা, সময় বাঁচানো, আর সহজ জীবনযাপনের পেছনে তাদের অবদান বিশাল। শহরের দ্রুত গতির জীবনে তারা অদৃশ্য সৈনিকের মতো কাজ করে যাচ্ছে। ক্লান্তি, কষ্ট, চাপ – সবকিছুর মাঝেও তারা প্রতিদিন নতুন করে শুরু করে। হয়তো আমাদের শুধু একটু সচেতন হওয়া দরকার। দরজা খুলে হাসিমুখে পার্সেল নেওয়া, একটি “ধন্যবাদ” বলা, বা এক গ্লাস পানি অফার করা – এই ছোট কাজগুলোই তাদের দিনের ক্লান্তি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। কারণ শহরের এই অদেখা নায়করা না থাকলে, আমাদের এই দ্রুত আর সুবিধাজনক জীবন এত সহজ হতো না।

 

লেখক: শাহাদাত হোসেন রাহাত

শিক্ষার্থী, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, সিদ্ধেশ্বরী কলেজ, ঢাকা

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!