পথ চলার ৪৭ বছরে ইবি

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বুকে বিস্তৃত সবুজের সমতলে দাঁড়িয়ে থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ; স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার পথচলার ৪৭ বছরে। সময়ের গায়ে জমা ইতিহাস, সংগ্রাম, প্রাপ্তি আর নতুন প্রত্যাশার আলোয় জায়গা করে নিয়েছে এই বিদ্যাপীঠ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রশাসনিক টানাপোড়ন, স্থানান্তর, উন্নয়ন-অবনয়নের নানা ধাপ পেরিয়ে এখন এটি দেশের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই দিন থেকেই শুরু হয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা বিস্তারের নতুন অধ্যায়। কিন্তু যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ১৯৮৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরিত হয় গাজীপুরের বোর্ডবাজারে। পরিবেশ, সংস্কৃতি, শিক্ষার ধারাবাহিকতা সবকিছুতে এই সরে যাওয়া ছিল বড় ধাক্কা। তবে দীর্ঘ আন্দোলন, দাবি ও প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন শেষে ১৯৯০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় আবার ফিরে আসে তার জন্মভূমি শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে। এরও আগে ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন’, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্ত ভিত্তি দেয়। এরপর ১৯৮১ সালে দায়িত্ব নেন প্রথম উপাচার্য ড. এ এন এম মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী যার হাত ধরে শুরু হয় একাডেমিক ভিত্তির দৃঢ় নির্মাণ। মাত্র ৪টি বিভাগ, ৮ শিক্ষক ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ইবির একাডেমিক কার্যক্রমের সূচনা হয়। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট পরিধি আজ বিস্তৃত হয়েছে ৮ অনুষদ ও ৩৬ বিভাগে। মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা থেকে ধর্মতত্ত্ব প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইবি এখন সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র। নতুন বিভাগ, স্মার্ট ক্লাসরুম, অনলাইন রিসোর্স, গবেষণা সহায়তা সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন যুগের চাহিদার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করছে প্রতিনিয়ত।
নান্দনিক স্থাপত্য ও প্রকৃতির সংমিশ্রণে ইবি ক্যাম্পাস দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ১৭৫ একর বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে রয়েছে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, সততার ফোয়ারা, মুক্ত বাংলা ভাস্কর্য এবং মনোমুগ্ধকর মফিজ লেক(মীর মুগ্ধ সরোবর) যা শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষা নয়, নান্দনিক অনুভূতিরও খোরাক যোগায়। দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্যাম্পাস মসজিদ এখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশের একটি অনন্য পরিচয়। আবাসনের ক্ষেত্রে রয়েছে ৮টি হল, চলমান রয়েছে কয়েকটি নতুন হল নির্মাণের কাজ। এছাড়া রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার, ক্রীড়াকেন্দ্র এবং বহুমুখী ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধা।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি। প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার বই, ১৯ হাজারের বেশি জার্নাল, ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্রের সংগ্রহ এবং অনলাইন অ্যাক্সেস সুবিধা গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও সম্প্রসারিত করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, ব্যবসা, আইন, সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) গবেষণা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে বহুগুণে।
ক্রীড়ায় ইবির সাফল্য প্রশংসনীয়। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ভলিবল, ফুটবল, ক্রিকেট, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় বহুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। খেলাধুলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তুলেছে। বিতর্ক, নাটক, সংগীত, সাহিত্য, আলোকচিত্র থেকে শুরু করে রোভার স্কাউট বহু সংগঠন শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের চর্চায় ভূমিকা রাখছে। তবে দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতায় কিছু অপ্রাপ্তিও রয়েছে। আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতা, সেশনজট এবং প্রশাসনিক জটিলতা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির পথে বড় বাধা। গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি ও আধুনিক ল্যাব স্থাপনের দাবি বহুদিনের। শিক্ষার্থীরা চান ইবি যেন গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার এই সন্ধিক্ষণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আজ দাঁড়িয়ে একটি নতুন যুগের দোরগোড়ায়। স্বপ্নসারথী হাজারো তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে ইবি হয়ে উঠুক আরও শক্তিশালী, আরও সমৃদ্ধ, আরও আলোকিত এই প্রত্যাশাই ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল উপলব্ধি।

