অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির সর্বনাশ

সবুজ বিপ্লবের সময় কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কৃষিজমিতে ফলন বৃদ্ধি করেছিল বহুগুণে। ক্ষুধার্ত পৃথিবীতে খাদ্যের জোগান দিতে এগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই আশীর্বাদই যেন পরিণত হয়েছে অভিশাপে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এখন মাটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকেই ধ্বংস করছে।বাড়তি ফসলের আশায় কৃষকেরা মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে খাদ্যের গুণগতমান নষ্টের পাশাপাশি মাটির উর্বরতা শক্তিও নষ্ট করছে। আবার অন্যদিকে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার বাড়িয়ে তুলছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জৈব কৃষি ও জনসচেতনতার বিকল্প নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে দেশের মোট আবাদযোগ্য ১ কোটি ৬০ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৬১ শতাংশে জৈব পদার্থের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, জমির উর্বরা শক্তি কমার মূল কারণ হচ্ছে-একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল চাষ এবং মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে ভেঙে পড়েছে মাটির স্বাস্থ্য।
ফসল উৎপাদনের সঙ্গে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মাটির উর্বরতা বলতে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানসমূহ সরবরাহের ক্ষমতাকে বোঝায়। অর্থাৎ মাটিকে তখনই উর্বর বলা হবে, যখন তাতে কোনো উদ্ভিদের পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সব খাদ্য উপাদান সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। অনুর্বর মাটিতে ফসলের ফলন হয় কম, আর উর্বর মাটিতে ফলন হয় আশাব্যঞ্জক। সুতরাং অধিক উৎপাদন পেতে হলে মাটির উর্বরা শক্তি বজায় রাখতে হবে।
সাধারণত ৪৫ শতাংশ খনিজ বা মাটির কণা, ৫ শতাংশ জৈব এবং ২৫ শতাংশ করে পানি ও বাতাস থাকা মাটিকে সুষম মাটি বলা হয়। একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা অতি প্রয়োজনীয় হলেও এ দেশের বেশিরভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, একই জমিতে যুগের পর যুগ একই ফসলের চাষ, জমিকে বিশ্রাম না দেওয়া, রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারের কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
বেশি ফলন পাবার আশায় বেশি বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন কৃষকরা। এতে জমির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জমির উর্বরা শক্তি। জমির উর্বরা শক্তি ঠিক রাখতে প্রয়োজন নানা ধরনের ফসল চাষ। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষও জমির উর্বরা কমার কারণ। ধাতব পদার্থের কারণে দূষিত হয়ে পড়ছে দেশের উর্বর মাটি(যেমন -আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, সীসা, নিকেল হচ্ছে ভারি ধাতব পদার্থ)
এসআরডিআইয়ের তথ্যমতে, কৃষিজমিতে স্বাভাবিকের তুলনায় দস্তার পরিমাণ কম। এর মধ্যে পদ্মা নদীর অববাহিকার মাটিগুলোয় চুন ও ক্ষারের মাত্রা অনেক বেশি। অন্যদিকে হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোয় আবাদি এলাকা নিচু এলাকা হওয়ার কারণে কৃষিজমিগুলো অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকে। এজন্য এসব অঞ্চলে দস্তার পরিমাণ দিনের পর দিন কমছে। দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে দস্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগত ফসল ফলানোর কারণে দেশের মাটিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে জৈব পদার্থ নেই। মাটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করায় উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত চাষাবাদ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দূষণ, ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস এবং অপরিকল্পিতভাবে সারের ব্যবহারের কারণে মাটির উবর্রতা শক্তি হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের অংশ তুলে নেওয়া ছাড়াও মাটির টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ফলে মৃত্তিকা এখন হুমকির মুখে রয়েছে। এসব কারণে মাটির স্বাস্থ্যহীনতায় এখন প্রতি বছর ফসল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির মাটির উর্বরতার মাত্রা শতকরা ২ দশমিক ৫ থেকে শতকরা ১ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আবাদযোগ্য জমির অর্ধেকই তার উৎপাদনক্ষমতা হারিয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি যৌথভাবে এ সমীক্ষা চালায়।
দক্ষিণ এশীয় অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জমির উর্বরতা হ্রাস পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। জমিতে অধিক মাত্রায় ও নির্বিচারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলেই মাটির উর্বরা শক্তি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই জমিতে বছরের পর বছর ধরে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির বিভিন্ন গুণগত বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাটির অম্লত্ব পরিবর্তিত হয়ে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে ও অণুজীবের কার্যাবলি ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাটির উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন টেকসই কৃষি পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হওয়া। জৈব সার ও কম্পোস্টের ব্যবহার মাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। গোবর, কেঁচো সার, উদ্ভিদাবশেষ বা সবুজ সার জমিতে যোগ করলে মাটির গঠন উন্নত হয় এবং অণুজীবের স্বাভাবিক কার্যকলাপ সক্রিয় হয়। এর পাশাপাশি সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে জৈব সার ও সীমিত পরিমাণ রাসায়নিক সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে জমি দীর্ঘমেয়াদে উর্বর থাকে এবং উৎপাদনও স্থিতিশীল হয়।
একই জমিতে বারবার একই ফসল উৎপাদন করাও মাটিকে দুর্বল করে তোলে। তাই ফসল পর্যায়ক্রম চাষ পদ্ধতি চালু করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ডাল জাতীয় ফসল জমিতে চাষ করলে মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন যোগ হয়, যা জমিকে পুনরুজ্জীবিত করে। অন্যদিকে, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারও মাটির প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। এর পরিবর্তে জৈব কীটনাশক ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা, সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে টেকসই কৃষির দিকে ঝুঁকবেন। প্রতিটি জমির জন্য মাটির স্বাস্থ্য কার্ড চালু করা হলে জমির প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে, যা অপচয় কমিয়ে আনবে।এছাড়াও সরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ প্রয়োজন। টেকসই কৃষি নীতি প্রণয়ন, ভর্তুকির মাধ্যমে জৈব সার সহজলভ্য করা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গবেষণা ত্বরান্বিত করা গেলে এ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এখন সময় এসেছে উৎপাদনের স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার। মাটি শুধু ফসল ফলানোর মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই মাটির প্রাণশক্তি রক্ষা করা মানেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

