বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা দূর হোক

Author

মোঃ রবিউস সানি জোহা , Islamic University

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৬৮ বার

একসময় ক্যারিয়ার মানেই ছিল স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি।বাবা মায়ের চোখে সন্তান মানেই ভবিষ্যতের ভরসা; পড়াশোনার ফলাফলই ছিলো জীবনের মোড় ঘোরানোর প্রধান হাতিয়ার। ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’‌- এই প্রবাদ ছিল বাঙালি সমাজের স্বপ্নবাণী। মায়ের আঁচলে ভেজা চোখে স্কুলে ছুটে যাওয়া কিংবা বাবার ঘামে রাঙা হাতের ত্যাগ – সবকিছুর ভরসা ছিল একটাই বিশ্বাস, পড়াশুনা শেষ হলেই সোনালি ভবিষ্যত হাতছানি দেবে।

কিন্তু সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা। আজকের তরুণ সমাজের কাছে ‘ক্যারিয়ার’ শব্দটি শুধুই আশার আলো নয় বরং তা পরিণত হয়েছে এক ভীতিকর শব্দে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঝলমলে সনদ হাতে নেওয়া তরুণ যখন হাজারো রঙিন স্বপ্নে বিভোর,ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় বন্ধ কপাট। চাকরির বাজার অতি প্রতিযোগিতামূলক, সুযোগ সীমিত এবং হতাশা অনিবার্য।যে পরিবার একদিন সন্তানকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছে,সেই পরিবার আজ দুশ্চিন্তায় ডুবে যায়। যে সমাজ সনদের বাহারে বাহবা দিয়েছে, সেই সমাজ আজ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়- চাকরি কোথায়?

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর – ডিসেম্বর কোয়ার্টারে সার্বিক বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ যা আগের বছরের তুলনায় ৩.৯৫ শতাংশ দৃশ্যত বেড়েছে। বিশেষত উচ্চ শিক্ষিতদের চিত্র আরো ভয়ংকর। গত পাঁচ বছরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৪ লাখ থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৮ লাখে পৌঁছেছে। এক দশক আগের তুলনা করলে চিত্র আরো হতাশাজনক। ২০১৩ সালে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব ছিলো ৯.৭ শতাংশ অথচ ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭.৮ শতাংশে। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ১০ হাজার, যার মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি।

বিশ্বায়নের এই যুগে শ্রমবাজারের দাবি বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(AI), অটোমেশন, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। অনেক পুরনো কাজ হারিয়ে যাচ্ছে। আবার নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ম্যাককিন্সের গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারাতে পারে। ভারত, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই আউটসোর্সিং, তথ্য প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করছে । তাই কেবল পরীক্ষার ভালো ফল বা সার্টিফিকেটের স্তূপই এখন আর নিশ্চয়তা নয়; আজকের পৃথিবী চায় এমন তরুণ যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, একাধিক ভাষায় সাবলীল, দলে কাজ করতে সক্ষম এবং পরিবর্তনের ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে জানে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগহীনতা, সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সরকারি নীতির অকার্যকারিতা মিলেই তরুণদের এই ক্যারিয়ার সংকট তৈরি করছে। চাকরি পাবে তো?এই প্রশ্নই যেন প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা।

আজকের তরুণ সমাজ দ্বিধাগ্রস্ত – একদিকে যেমন স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা নেই, অন্যদিকে উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশও এখনো যথেষ্ট অনুকূল নয়। উদ্যোক্তা হতে গেলে চাই পুঁজি, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা , যা অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে তারা ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে দিশাহীনতার শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। হতাশা, অবসাদ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্তও নিচ্ছে অনেকে। ক্যারিয়ার শব্দটি তাই তাদের কাছে আর সম্ভাবনার দ্বার নয় বরং এক নীরব আতঙ্ক।

এই অচলায়তন হতে বাঁচতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। কেবল ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন বাস্তব প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনমূলক শিক্ষা। দ্বিতীয়ত, সরকার ও বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, তরুণদের মানসিক সহায়তা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সহজলভ্য সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, চাকরির বাজার সম্পর্কে জানা এবং নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এছাড়াও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের প্রত্যক্ষ তৎপরতার ফলেই সম্ভব তরূণদের হতাশা লাঘব করার।

তরুণ সমাজ একটি দেশের মেরুদণ্ড। তাদের হাতেই লুকিয়ে আছে নতুন ভোরের সূর্যোদয়, একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ। যদি এই প্রজন্ম হতাশার অন্ধকারে ডুবে যায়, তবে এ জাতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই এখনই সময় ক্যারিয়ারকে ভয়ের নাম থেকে আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে গড়ে তোলার।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!