মাহে রমজানে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়

আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত দয়াময় ও পরম করুণাময়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লজ্জাশীলও। যখন কোনো বান্দা তার নিকট দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে তখন তিনি তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। রমজানে এ সময়টিতে দোয়া করে কাঙ্ক্ষিত জিনিস লাভের সুর্বণ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন রোজাদাররা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন, আয়াত-৬০)
রাসুলে করিমকে (সা.) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কোন সময়ের দোয়া মহান আল্লাহ বেশি গ্রহণ করেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন-
‘রাতের দুই-তৃতীয়াংশ শেষের দোয়া অর্থাৎ রমজানের সাহরির সময়ের দোয়া বেশি কবুল হয়। সুরা আল আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর (সা.) মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”
দোয়া কবুল হওয়ার আনন্দই আলাদা। চোখের পানি ফেলে তাওবা, তাসবিহ ও দরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে মূল্যবান সময়ে দোয়া করলে মহান আল্লাহ কবুল করে নেবেন। এজন্যই চাই দোয়া কবুলের সময়কে কাজে লাগানো। দোয়া কবুলের মূল্যবান সময়ের মধ্যে অন্যতম একটি সময় হলো ফরজ নামাজের পর ও রাতের শেষ অংশে। তখন দোয়া করলে মহান আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন। আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ লাভের অতি মূল্যবান দুটি সময় আছে রমজান মাসে।
প্রথম সময় : ফজরের আগে- প্রিয় নবীর (সা.) ঘোষিত রাতের দুই-তৃতীয়াংশের পরের সময় এটি। এ সময় দোয়া কবুলের জন্য বিশেষ সময়। এ সময়টি আল্লাহ তাদের চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়ে ডাকতে থাকেন- ‘কে আমাকে ডাকবে? যার ডাকে আমি সাড়া দেব।’
এ মুহূর্তে যে আল্লাহকে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ডাকবে এবং আহ্বান করবে আল্লাহতায়ালা তাকে চাহিদা মোতাবেক দান করবেন- ফজরের আগের সময়টি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদা ও সম্মানের এবং বিশেষ সময়। এ সময়টিতে আল্লাহতায়ালা সবসময় প্রথম আসমানে আসেন এবং বান্দাকে তাদের চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়ে ডাকতে থাকেন। যারা এ সময়টিতে আল্লাহর কাছে কাঙ্ক্ষিত জিনিস চায়, আল্লাহতায়ালা তাদের ডাকে সাড়া দেন এবং কাঙ্ক্ষিত জিনিস দান করেন। রমজানের শেষ রাতের কোনো আবেদন বিশেষ করে আল্লাহ অগ্রাহ্য করেন না। বান্দা যা চায় তাই কবুল করে নেন। তাই রমজানের শেষ রাতের গুরুত্ব অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সাহরি গ্রহণ : শেষ রাতের দোয়ার পরপরই রোজার জন্য সাহরি গ্রহণ করা জরুরি। কারণ দিনভর রোজা রেখে কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ পড়া এবং রোজগারের জন্য শক্তি সঞ্চার করতে সাহরি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণের। আর যারা সাহরি গ্রহণ করে ফেরেশতারা তার কল্যাণ ও মাগফিরাতে দোয়া করতে থাকেন।
দ্বিতীয় সময় : মাগরিবের আগে- ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে বান্দা রোজায় ক্লান্ত, পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত থাকে। এ সময়টিতে ইফতার সামনে নিয়ে আল্লাহর কাছে বান্দার যেকোনো প্রার্থনাই কবুল হয়ে যায়। এ সময় মানুষ দুর্বল ও মানুষের হৃদয় নরম থাকে। আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসায় হৃদয় থেকে আল্লাহর কাছে যেকোনো প্রার্থনাই কবুল হয়ে যায়। আল্লাহর মহব্বতে হৃদয় ভরপুর থাকে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে বান্দা আল্লাহর হুকুম পালনে প্রচণ্ড ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় খাবার সামনে থাকা সত্ত্বেও খাওয়া থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে। সে সময়টি আল্লাহর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং তা দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
মুসলিম ভাইবোনদের কর্তব্য দোয়া কবুলের এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দুটি সময় অবহেলায় ত্যাগ না করা। শেষ রাত তাওবা-ইসতেগফারে অতিবাহিত করা এবং সাহরি খাওয়া। ইফতারের আগের মুহূর্তটিতে ইফতারি ও রান্না-বান্নাসহ সব কাজ শেষ করে কিছু মুহূর্ত তাওবা-ইসতেগফারের সঙ্গে ইফতারের জন্য অপেক্ষা করা। রমজানে অধিকাংশ মানুষ এই সময়টা ঘুমিয়ে থাকে, কিন্তু এ সময় দোয়া কবুল করানো, ক্ষমা ও আল্লাহর অনুগ্রহ লুফে নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
এ ছাড়াও দোয়া কবুলের জন্য অন্যতম সময় লাইলাতুল ক্বদর। শুধু রমজান নয়, বরং সারা বছরের মধ্যে অন্যতম ফজিলতপূর্ণ রাত হলো লাইলাতুল ক্বদর। এ রাত দোয়া কবুলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ রাতে মাগরিব থেকে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে ক্ষমার ঘোষণা দেওয়া হয়। অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
দোয়া কবুলের জন্য মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য সপ্তাহে একটি বিশেষ দিন উপহার দিয়েছেন। স্বীয় বান্দারা যেন তাদের দোয়া প্রভুর দরবারে কবুল করিয়ে নিতে পারে। তাহলো জুমার দিনের দোয়া।
সহিহ বুখারী শরীফে পাওয়া যায়, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) জুমার দিন সম্পর্কে অলোচনায় বলেন, ‘এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যেকোনো মুসলিম বান্দা যদি এ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করেন, তবে তিনি তাকে তা অবশ্যই দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত।’
সুনানে আবু দাউদ শরীফের বর্ণনায় রয়েছে, ‘আসর হতে মাগরিব পর্যন্ত।’ আবার সহিহ মুসলিম শরীফের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘জুমার দিন দোয়া কবুলের চূড়ান্ত সময়, ইমামের মিম্বরে বসা হতে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।’
পরিশেষে বলা যায়, রমজানে দোয়া কবুলের বিশেষ কিছু সময় থাকলেও সারা মাসজুড়েই চলে ক্ষমা এবং অনুগ্রহ দানের এক মহোৎসব। সুতরাং রমজানে সবসময় দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে কাটানো উচিত।

