নারী স্বাবলম্বী হয়েছে, পুরুষ কবে হবে?

সাহরির সময় সবার আগে জেগে ওঠেন মা। ঘুম থেকে উঠেই তাঁর কর্মযজ্ঞ শুরু হয়—বাড়ির সবার জন্য সাহরি প্রস্তুত করতে হবে। এক ঘন্টা পর চোখ কচলাতে কচলাতে গরম গরম খাবারের সামনে এসে বসেন পরিবারের বাকিরা। এটা আমাদের এক অতি পরিচিত চিত্র।
আমাদের সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই ঘরের কাজকর্ম শেখানো হয়ে থাকে। ছেলেরা ঘরে কোনো কাজকর্ম করবে না, বরং পরিবারের নারী সদস্যদের উপরে নির্ভর করবে এটাই যেন এখানকার অলিখিত নিয়ম। ধর্ম, সংস্কৃতি, সাহিত্য ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত মেয়েদের বোঝানো হয় যে ঘরের কাজ করা তাদেরই দায়িত্ব, আর ছেলেদের দায়িত্ব শুধু অর্থ উপার্জন করা। ফলতঃ বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে তিনগুণ বেশি গৃহকর্ম করে থাকেন। Oxfam এর ২০২০ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীদের এসব অবৈতনিক গৃহকর্মের আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ১০.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, বাচ্চা সামলানো, ঘর পরিষ্কার করা, রান্নাবান্না করা ইত্যাদি যেই কাজগুলো তাঁরা বিনামূল্যে করছেন, তার বিনিময়ে বেতন নিলে তা এই পরিমাণে দাঁড়াতো। কিন্তু এই সুবিশাল অবদানের বিনিময়ে নারীরা কতোটুকু স্বীকৃতি পান?
নারীদের অদৃশ্য পরিশ্রমে আমাদের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। রমজান, ঈদ, পূজাপার্বন, বড়দিন ইত্যাদি বিভিন্ন উৎসবে যে অপার্থিব আনন্দ আমরা অনুভব করি, তার পেছনে কাজ করে আমাদের নানী, দাদী, মা, খালা, মামী, চাচী ও বোনদের শ্রম। মজার মজার খাবার রান্না, ঘরদোর সাজিয়ে উৎসবমুখর করে তোলা, বাচ্চাদের জন্য শপিং করা ইত্যাদি নানাবিধ কাজ করে তাঁরা আমাদের কাছে এই দিনগুলোকে আনন্দময় করে তোলেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি, ঈদের দিন সকালে বাড়ির পুরুষরা রওনা দেন মসজিদে, আর নারীরা ঢুকে যান রান্নাঘরে। নামায শেষে মুসল্লীরা বাড়ি ফিরেই পান গরম গরম সুস্বাদু খাবার যা ঈদের আনন্দকে পরিপূর্ণতা দেয়। আর এর পেছনে নীরব পরিশ্রম দিয়ে যান পরিবারের নারী সদস্যরা। অনেক এলাকায় এখনও নারীদের মসজিদে ঈদের নামায পড়ার সুযোগ নেই। ফলে ঈদের সকালটা তাঁদের রান্নাঘরেই কাটে। পুরুষদের মতো জামাতে নামায পড়া, সুহৃদদের সাথে কোলাকুলি করার অনাবিল আনন্দ থেকে নারীরা বঞ্চিত।
আমরা প্রায়ই শুনি যে নারীরা ঘরের রানী, স্বামী-সন্তানের যত্ন নেয়া একটি মহান কাজ; অথচ যারা এগুলো বলেন তারাই আবার এগুলোকে দুর্বলতার প্রতীক ভাবেন, সুযোগ পেলেই অপমানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। মেয়েরা কোনো ব্যাপারে মতামত দিতে গেলে “রান্নাঘরে ফিরে যাও”, “নারীর কাজ হলো ঘরে থাকা আর সন্তান লালন পালন করা”, “মেয়ে মানুষ এতো বুঝবে না” ধরণের কথা বলে তাদের চুপ করানোর চেষ্টা উপমহাদেশের আবহমানকালের সংস্কৃতি। পুরুষদের অপমান করতে অনেক সময় “শাড়ি-চুড়ি পরে বসে থাকো” ধরণের কথা বলা হয়। অর্থাৎ, যারা মুখে বলেন ঘরসংসার করা খুব সম্মানের, তারাই কিন্তু আবার ভেতরে ভেতরে সেটা বিশ্বাস করেন না। বরং তাদের কাছে নারীদের ঘরের কাজ করাটা একটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো ব্যাপার, স্বল্প বুদ্ধির পরিচায়ক, দুর্বলতার প্রতীক। আর তাই এই “তুচ্ছ” কাজগুলো তারা সুকৌশলে নারীর একার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ এই কাজগুলো না করা হলে নারীদের ছোট করা এই বীরপুঙ্গবদের পেটে ভাত থাকতো না, পরিধানযোগ্য পোশাক থাকতো না, বাসযোগ্য ঘর থাকতো না।
বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ই অর্থ উপার্জন করছেন। অথচ একজন পুরুষ যেখানে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফিরে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেরকম একজন নারী পারেন না। নারীকে সারাদিন কর্মক্ষেত্রে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে বাড়ি ফিরে আবার ঘরের কাজকর্ম করতে হয়। পুরুষের কাজ দিনে কয়েক ঘন্টা, সাথে থাকে সাপ্তাহিক ছুটি, মাসশেষে বেতন। নারীর কোনো ছুটি নেই, বেতন নেই, এমনকি তার প্রতি কারও সামান্য কৃতজ্ঞতাও নেই। সারাদিন, সারা সপ্তাহই তার অবৈতনিক কাজ। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তার কাজ আরও বেশি।
রমজানে সারাদিন পুরুষও রোজা রাখেন, নারীও রোজা রাখেন। কিন্তু সাহরি, ইফতারে বাড়ির সবার জন্য সুস্বাদু খাবার রান্না করা, সবাইকে ডেকে তোলা, খাওয়া শেষে থালাবাসন পরিষ্কার করা যেন একা নারীরই কর্তব্য। রোজা রেখে ক্লান্ত হয়ে পুরুষরা বিশ্রাম নেন, কিন্তু নারী যতোই ক্লান্ত হোক তাকে গরম চুলার সামনে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা রান্না করতে হয়। রোজাদার মাত্রই জানবেন ইফতারের পর শরীরের ক্লান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়—নড়াচড়ার শক্তি থাকে না। কিন্তু তখনও পরিবারের নারীদের বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ নেই কারণ ময়লা থালাবাসনগুলো তাদেরকেই পরিষ্কার করতে হয়।
বিয়ের পরে পুরুষের কাজ কমে যায়। একজন অবিবাহিত পুরুষকে যেই কাজগুলো নিজের হাতে করতে হয় বা কাউকে টাকা দিয়ে করিয়ে নিতে হয়, বিয়ের পর সেই কাজগুলো তার স্ত্রী বিনা বেতনে করে থাকেন—যার জন্য একজন গৃহকর্মী মাসে হাজার হাজার টাকা বেতন নিতেন। পক্ষান্তরে, বিবাহিতা একজন নারীর দায়িত্ব বেড়ে যায়। বিয়ের আগে তিনি যেই কাজগুলো শুধু নিজের জন্য করতেন, বিয়ের পরে সেগুলো দুইজনের জন্য করতে হয়। আগে হয়তো তাকে শুধু নিজের কাপড় কাচতে হতো, এখন স্বামীর কাপড়চোপড়ও কাচতে হয়। আগে শুধু নিজের খাবারটা রাঁধতে হতো, এখন স্বামীর জন্যও রাঁধতে হয়। সন্তান জন্মালে কাজের ভার আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ পুরুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি পরিশ্রম করেও অনেক নারীকে দিনশেষে খোঁটা শুনতে হয়, “সারাদিন ঘরে বসে কী করো?”।
একজন ব্যাচেলর পুরুষ নিজের হাতে রান্না করছে, ঘর ঝাড়পোঁছ করছে এটাকে আমাদের সমাজে খুবই করুণ একটা ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই দৃশ্য দেখে মানুষ আহা-উহু করতে থাকে, এটা কতো বড় দুঃখের ব্যাপার তা নিয়ে অনেক কৌতুক প্রচলিত। কিন্তু একই কাজ যখন নারীরা প্রতিনিয়ত করে থাকেন, হোক সে ব্যাচেলর বা বিবাহিতা, তখন কারও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন পুরুষের গৃহকর্ম করাটা একটা বিশাল ট্র্যাজেডি, পক্ষান্তরে নারীদের জন্য সেটাই স্বাভাবিক। অথচ রান্না, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার রাখা এগুলো বেসিক সার্ভাইভাল স্কিল, কোনো বিশেষ জেন্ডারের দায়িত্ব নয়৷ টিকে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এই কাজগুলো করতে পারা দরকার। যার বেঁচে থাকতে খাওয়া দরকার, তার উচিত সেই খাবারটা রান্না করতে জানা। যার জামাকাপড় পরিধান করতে হয়, তার উচিত সেগুলো পরিষ্কার করতে পারা। এমন তো না যে খাবার শুধু নারীদেরই খেতে হয়, কাপড় শুধু তাদেরই পরতে হয়, ঘরে শুধু তাদেরই বাস করতে হয়—পুরুষদেরও তো সেগুলো কোনো অংশে কম প্রয়োজন নয়। তাহলে কেন এই কাজগুলো শুধু নারীদেরই করতে জানতে হবে?
নারীরা এগিয়ে গেছেন—তাঁরা অতীতের তুলনায় বেশি অর্থ উপার্জন করছেন। অথচ পুরুষরা এখনও আগের যুগেই পড়ে আছেন। নারীরা স্বাবলম্বী হলেও পুরুষরা এখনও রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার রাখা, নিজের জামাকাপড় পরিষ্কার রাখা ইত্যাদির জন্য পরিবারের নারীদের উপরে নির্ভরশীল। আবারও মনে করিয়ে দিই, এই কাজগুলো যদি তাঁরা বিনামূল্যে না করে বেতনের বিনিময়ে করতেন, তবে পুরুষদের হাজার হাজার টাকা খরচ হতো। নারীরা এখন অর্থের জন্য পুরুষের উপরে নির্ভরশীল নন। কিন্তু পুরুষরা এখনও অর্থ উপার্জন বাদে বাকি সবকিছুর জন্য পরিবারের নারীদের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, নারীকে স্বাবলম্বী করার চাইতে এখন পুরুষদের স্বাবলম্বী করাটা বেশি প্রয়োজন।
শিক্ষা, গবেষণা, কর্মক্ষেত্র, অর্থ উপার্জন সবকিছুতেই নারীরা এখন অতীতের তুলনায় বেশি অবদান রাখছেন। কাজেই পুরুষদেরও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ঘরের কাজের জন্য নারীদের উপরে নির্ভরশীল না থেকে নিজেও দায়িত্ব নেয়া উচিত। “পুরুষরা তো অর্থ উপার্জন করে” এই কথা বলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নারীরাও অর্থ উপার্জন করেন। পরিবারের নারী সদস্যরা যদি কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে ঘরের কাজকর্ম করতে পারেন, তবে পুরুষদের তা করতে না পারার কোনো কারণ নেই। অর্থ উপার্জন, নিজের ঘরের এবং পরিবারের প্রতি উদাসীনতার অযুহাত নয়।
সমতা শুধু নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের মাধ্যমে আসবে না, বরং পরিবারের মধ্যেও সমতা আনতে হবে। পরিবর্তনের শুরুটা নিজের ঘর থেকেই করতে হবে। নারী ঘরের কাজ করবে, পুরুষ বাইরের কাজ করবে এই মেয়াদোত্তীর্ণ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। ঘরে-বাইরে নারী, পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও কর্তব্য নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সমাজের উন্নতি সম্ভব। আর এই উন্নতির শুরুটা নিজেকে দিয়েই করতে হবে।
