Gen Z এর নীরব আর্তনাদ :বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার ছায়া
- Gen Z এর নীরব আর্তনাদ :বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার ছায়া
দরজার ওপাশে শুধু নীরবতা। ঘরের ভেতরে কোনো শব্দ নেই ,শুধু অসমাপ্ত নোটবই, খোলা খাতা, এবং নিথর দেহ। আগের দিনও সে বন্ধুদের সঙ্গে হেসে খেলেছিল, ক্লাসে উপস্থিত ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনছিল। কেউ বুঝতে পারেনি সেটাই ছিল তার শেষ দিন।
বর্তমান সময়ে প্রায়ই শোনা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করলে আমাদের চোখে পড়ে হাসিখুশি, মেধাবী, স্বপ্নবাজ এক তরুণ বা তরুণী আর নেই। এই খবরগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয় বরং একের পর এক যেন জমে উঠছে এক নিঃশব্দ শোকগাঁথা।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও সেই উদ্বেগকে আর অনুমানের জায়গায় রাখছে না। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত বছরে ৪০৩ জন আত্মহত্যা করছে। এক বছরে শত শত শিক্ষার্থীর আত্মহননের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞানের কেন্দ্র নয়, মানসিক সংকটেরও এক নীরব মানচিত্রে পরিণত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ।
প্রতিটি ঘটনাই একটি পরিবারে চিরস্থায়ী শূন্যতা, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি থেমে যাওয়া সম্ভাবনা। একটি তরুণ প্রাণের প্রস্থান মানে শুধু একটি জীবনের অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মায়ের অনন্ত অপরাধবোধ, বন্ধুর আজীবন আঘাত, শিক্ষকের নীরব অনুশোচনা, আর সমাজের এক ব্যর্থ নৈতিক কাঠামো। এটি আমাদের সময়ের গভীরতম সামাজিক ও মানসিক অসুস্থতার দলিল।
প্রতিদিনের খবর যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। কখনো আবাসিক হলের একটি কক্ষ, কখনো ভাড়া বাসার নিঃসঙ্গ ঘর, কখনো বা ক্যাম্পাসের নির্জন কোনো কোণ। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—কেন?
বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়, যেখানে নতুন জীবন শুরু হয়, সেই ক্যাম্পাসগুলোতেই আজ ছায়া ফেলছে এক অদৃশ্য অন্ধকার।বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ছিল মুক্ত চিন্তার আঙিনা, ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা, আর জীবনের সবচেয়ে দীপ্ত সময়ের প্রতিশ্রুতি। অথচ আজ সেই ক্যাম্পাসের করিডোরে, লাইব্রেরির নিস্তব্ধ টেবিলে, হলের ছোট্ট কক্ষে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে প্রোফাইলের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অন্ধকার Gen Z-এর নীরব আর্তনাদ। বাইরে থেকে তারা স্মার্ট, আপডেটেড; ভেতরে ভেতরে অনেকে ক্লান্ত, বিপর্যস্ত, একাকী, আর ভেঙে পড়ার শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো। এই প্রজন্ম, যারা প্রযুক্তির আলোয় বেড়ে উঠেছে, তাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল মনে হয়, ভেতরে ভেতরে ততটাই জটিল, ততটাই ভাঙাচোরা।
অথচ এই প্রজন্ম অলস নয়, অতিনাটকীয়ও নয়। তারা এক কঠিন সময়ের সন্তান। তারা মহামারির অভিঘাত দেখেছে, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা দেখেছে, অর্থনৈতিক চাপ দেখেছে, ডিজিটাল যুগের নিরবচ্ছিন্ন তুলনা ও বিচ্ছিন্নতার ভেতর বড় হয়েছে। তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু আবেগের দিক থেকে অনেক বেশি বিপন্ন।
আরও একটি নির্মম বাস্তবতা হলো আমরা সন্তানদের সাফল্যের ভাষা শিখিয়েছি কিন্তু বেঁচে থাকার ভাষা শিখাইনি।আমরা সন্তানকে বলেছি প্রথম হতে, বলিনি হেরে গেলেও তুমি মূল্যহীন নও।আমরা তরুণকে বলেছি শক্ত হও, কিন্তু বলিনি ভেঙ্গে পড়া আবার উঠে দাঁড়ানো—এসবও মানুষেরই অংশ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার অনেক কারণ বিদ্যমান।এর মধ্যে প্রেম ও সম্পর্কভঙ্গজনিত মানসিক আঘাত এখন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতারণা, বিচ্ছেদ, প্রত্যাখ্যান, একতরফা ভালোবাসার ব্যর্থতা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ফাঁসের ভয় এসব অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য গভীর মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠছে। আবেগপ্রবণ বয়সে সম্পর্ককে জীবনের কেন্দ্র মনে করার প্রবণতা থাকায় বিচ্ছেদ অনেকের কাছে সাময়িক কষ্ট নয়, বরং অস্তিত্বসংকট হয়ে দেখা দেয়।এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একাডেমিক চাপ, সিজিপিএ নিয়ে উৎকণ্ঠা, পরিবারের উচ্চ প্রত্যাশা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।পড়াশোনার খরচ, শহুরে জীবনযাপন, চাকরি নিয়ে উদ্বেগ এসব অনেক শিক্ষার্থীকে হতাশ করে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনামূলক সংস্কৃতি তাদের ভেতরে হীনম্মন্যতা, একাকীত্ব ও ব্যর্থতার অনুভূতি বাড়ায়। বাইরে সবাইকে সুখী ও সফল দেখে নিজের জীবনকে অনেকেরই ব্যর্থ মনে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের সমাজ এখনও মানসিক বিপর্যয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শেখেনি। কারও দীর্ঘদিনের অবসাদকে বলা হয় “অতিরিক্ত ভাবনা”, কারও আতঙ্ককে বলা হয় “দুর্বলতা”, কারও কান্নাকে “নাটক”, আর কারও নিঃসঙ্গতাকে “অভিমান” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে একজন বিপন্ন তরুণ যখন সবচেয়ে বেশি শোনা, বোঝা এবং আগলে রাখার প্রয়োজন বোধ করে, তখন সে পায় অবহেলা, উপদেশ, কিংবা নীরব বিচার। অনেকেই তাই মুখ বন্ধ করে ফেলে। আর এই চুপ করে যাওয়াটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এই সংকটের সমাধান কেবল শোকবার্তা, মানববন্ধন বা ফেসবুক পোস্টে নেই। প্রয়োজন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, শিক্ষক-অভিভাবক সচেতনতা, এবং আত্মহত্যা-ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ব্যর্থতার আয়না। একটি ক্যাম্পাস যদি মেধাবী তরুণে পূর্ণ হয়, অথচ মানসিকভাবে নিরাপদ না হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প অসম্পূর্ণ। ডিগ্রি দিয়ে মানুষ তৈরি করা যায় না, যদি তার বেঁচে থাকার শক্তিটুকু ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়।বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল যদি স্বপ্ন ধারণ করতে পারে, তবে তাকে শিক্ষার্থীদের নীরব আর্তনাদও শুনতে হবে। ক্যাম্পাস যদি ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা হয়, তবে তা শুধু ডিগ্রির নয়—মানসিক নিরাপত্তারও জায়গা হতে হবে। নইলে আমরা আরও কিছু মেধাবী মুখ হারাব, আরও কিছু সম্ভাবনা অন্ধকারে ডুবতে দেখব, আরও কিছু বিদায়কে “অপ্রত্যাশিত” বলে সান্ত্বনা দেব । এছাড়াও পরিবারকে হতে হবে সন্তানের প্রথম নিরাপদ আশ্রয়, সমাজকে হতে হবে সহানুভূতির জায়গা, আর রাষ্ট্রকে হতে হবে কার্যকর সুরক্ষার কাঠামো।
কিন্তু নীরবতাকে যদি আমরা আরেকটু দীর্ঘ করি,
তবে এই প্রজন্মের কান্না একদিন শুধু পরিসংখ্যান হয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসবে।আর তখন খুব দেরি হয়ে যাবে।
স্বপ্নের বয়সে যখন তরুণেরা ভেঙে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সংকট শুধু তার ব্যক্তিগত নয় ব্যর্থ পরিবার, অসংবেদনশীল সমাজ আর অপ্রস্তুত রাষ্ট্র মিলেই এই অন্ধকারকে ঘন করেছে। এখনই শোনার, বোঝার ও পাশে দাঁড়ানোর সময়; নইলে ক্যাম্পাসে আলো জ্বলবে কিন্তু নিভে যাবে ভবিষ্যৎ।শিমলা পাল
শিক্ষার্থী,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: simlapaul02@gmail.com
মোবাইল নাম্বার: ০১৯৩৩০৪৬৭৩৮
লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

