বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

“স্বপ্ন, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের এক মহাকাব্য – ২৬ শে মার্চ”

Author

মোঃ রবিউস সানি জোহা , Islamic University

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১১০ বার

২৬শে মার্চ – একটি তারিখ, একটি মুহূর্ত, একটি চেতনা। এদিনই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়, পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে। তবে এই স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল বহু আগে, বাঙালির আত্মত্যাগ, আন্দোলন, ভাষা সংগ্রাম এবং রক্তস্নাত বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে।

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের রক্ত অক্ষরে লেখা অনন্য এক গৌরবোজ্জ্বল দিন ২৬ শে মার্চ (স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস) । তবে এই দিনটি আসার পেছনের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখতে পাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষ তথা বাঙালিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। প্রথমেই বাঙালিদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে এককভাবে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। গর্জে ওঠে বাঙালি, গড়ে তুলে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারিতে বাংলার দামাল তরুণদের জীবন দেয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাঙালিদের রাজনৈতিক ঐক্য যুক্তফ্রন্ট বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে অল্পকালের মধ্যেই ভেঙে দেয় প্রাদেশিক যুক্তফ্রন্ট সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ছয় দফা ও এগার দফা আন্দোলন। আন্দোলন ক্রমেই গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন । ক্ষমতায় আসলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই নির্বাচন দেন।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় না। শুরু হয় ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র। ইয়াহিয়া তথা সরকারপক্ষ আলোচনায় বসতে চাইলেন এবং বসলেন। এবার শুরু হলো আলোচনার নামে কালক্ষেপণ। এতসব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এ বিশাল জনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। পরবর্তীতে ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর। পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ড চালায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন। যা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে।
স্বাধীনতার ঘোষণার পরই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ শুরু হয়, যা সারা দেশে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এরপর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে বিজয়, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ও অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণমুখী, মানবিক, প্রগতিশীল স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা, শোষণ, বৈষম্য, অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখীসমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেটি হাসিল হয় ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার মানুষ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসনের ২৪ বছরের গ্লানি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। লাখ লাখ শহীদের রক্তে রাঙানো আমাদের স্বাধীনতার সূর্য। তাই এ দেশের জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবস সবচাইতে গৌরবময় ও পবিত্রতম দিন।এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই অকুতোভয় বীরদের, যাঁরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন আমাদের স্বাধীনতার জন্য। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে স্বাধীনতা কেবল অর্জনের বিষয় নয়, এটিকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের দিনে আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে দুর্নীতি, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও অরাজকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ২৬শে মার্চ আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়, আমাদের প্রেরণার দীপশিখা হয়ে জ্বলতে থাকে—বাংলাদেশের মানচিত্রে, আমাদের হৃদয়ে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!