বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

“ধর্ষকের শাস্তি কঠোর হোক, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক”

Author

মোঃ রবিউস সানি জোহা , Islamic University

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৭৮ বার

সাম্প্রতিক কালে ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতা একটি একটি মহামারী রুপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই নারীদের প্রতি ভয়াবহ সহিংসতার খবর।যা আমাদের সমগ্র সমাজের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। আইন- শৃঙ্খলা অবনতির বহিঃপ্রকাশও বটে।

ধর্ষণ হল এক ধরনের যৌন সহিংসতা, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যের সম্মতি ছাড়াই জোরপূর্বক যৌন কার্যক্রমে জড়িত হয়। এটি একটি অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করা হয়, তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা, ভয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা মামলা করতে এগিয়ে আসেন না।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ধর্ষণের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
মোট ৪০১ জন নারী ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৪ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন এবং ৭ জন আত্মহত্যা করেন। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১০৯ জন, যার মধ্যে একজনকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়। এছাড়া, যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১৬৬ জন নারী। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫২৩ জন নারী, যার মধ্যে ২৭৮ জন মারা গেছেন এবং ১৭৪ জন আত্মহত্যা করেছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুসারে, শিশু ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতাও ব্যাপক হারে ঘটেছে। ২০২৪ সালে ৩৩১ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৮২ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হন এবং ৭ জন ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা আরো বেশী পরিলক্ষিত। শিশু আছিয়া ধর্ষণের ঘটনা সাড়া বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার পেছনে রয়েছে নানাবিদ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
লিঙ্গ বৈষম্য, বাংলাদেশে নারীদের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও নারীকে দুর্বল হিসেবে দেখা। এই লিঙ্গ বৈষম্য ধর্ষণের মতো অপরাধকে উৎসাহিত করে। সমাজে নারীদেরকে পুরুষের অধীনস্থ হিসেবে দেখা হয়, যা তাদেরকে সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে।আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ধর্ষণের মামলায় দোষীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে আইনের ফাঁক-ফোকর ও দুর্নীতির কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধর্ষণকে উৎসাহিত করে।ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা, বিষন্নতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবের শিকার হন। পরিবার ও সমাজের মধ্যে এই ঘটনাগুলো অস্থিরতা ও ভয়ের সৃষ্টি করে। তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবী।

ধর্ষণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং সরকারি পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগ হলো:

1. আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ:
দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি: ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট চালু করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি: পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ জোরদার করা যাতে তারা নারী নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার: ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন ও মনোসামাজিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা।

2. সামাজিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ:
সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

লিঙ্গ সমতার শিক্ষা: পাঠ্যসূচিতে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও লিঙ্গ সমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।

নারীদের আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ: নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা।

3. প্রযুক্তি ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা:

সিসিটিভি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: স্কুল, কলেজ, অফিস ও গণপরিবহনে নজরদারি বাড়ানো।

হেল্পলাইন ও মোবাইল অ্যাপ: ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হলে দ্রুত সহায়তার জন্য জরুরি হেল্পলাইন চালু করা (যেমন: বাংলাদেশে ১০৯ হেল্পলাইন)।

4. পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকা:

পরিবারের ভূমিকা: সন্তানদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও সহমর্মিতা তৈরির মাধ্যমে ধর্ষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা।
পুরুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি: ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও সচেতন করা এবং ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলা।

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকার, সমাজ ও ব্যক্তি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সঠিক বিচারিক প্রক্রিয়া ও ধর্মীয় শাসন ও নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে এ সংকট নিরসন করতে হবে। ধর্ষকদের কঠোর থেকে কঠরোতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে পরবর্তীতে কোন অপরাধ করার সাহস না পায়। এছাড়াও ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা এড়ানো সম্ভব।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!