বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

জুম্মার দিন সাপ্তাহিক ঈদ, মুমিনের শ্রেষ্ঠ দিবস

Author

তৌফিক সুলতান , ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১৩৫৩ বার

 

ফজিলতে ভরা এক মুবারক দিন

পবিত্র জুম্মার দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য সপ্তাহের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত দিন। এই দিনের মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে আল্লাহ তাআলা একে সাপ্তাহিক ঈদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। হাদীসে কুদসিতে এসেছে, “আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য জুম্মার দিনকে ঈদস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।” এই দিনটি শুক্রবার নামে পরিচিত হলেও ইসলামী পরিভাষায় এর নাম “জুম্মা” যা সমবেত হওয়া বা একত্রিত হওয়ার অর্থ বহন করে। সূর্য উদয় থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত এই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত বরকত ও রহমতে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে আসমানী নূরের প্রকাশ, দোয়ার কবুলিয়াত এবং গুনাহ মাফের ক্ষেত্রে এই দিনটির কোন তুলনা নেই। বিশ্বের সকল মুসলিম এই দিনটিকে সামনে রেখে সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করেন, কেননা এই দিনে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয় এবং বান্দার জন্য রয়েছে অগণিত কল্যাণ।

জুম্মার দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদার প্রমাণ

জুম্মার দিনের ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “সূর্য উদয় হয় যেসব দিনে, তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুম্মার দিন। এই দিনেই আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে।” (সহীহ মুসলিম) এই একটি হাদীসেই জুম্মার দিনের ফজিলত স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, “যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে জুম্মার নামাজে উপস্থিত হয়, মনোযোগ সহকারে খুতবা শোনে এবং নিরর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে, তাহলে এ জুম্মা থেকে পরবর্তী জুম্মা পর্যন্ত এবং আরও তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহীহ মুসলিম) এটি মুমিনের জন্য এক বিরাট সুসংবাদ যে সপ্তাহের একটি দিনকে কেন্দ্র করে এত বিপুল পরিমাণ গুনাহ মাফের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে।

জুম্মার দিনের আমল ও ইবাদতের বিশেষত্ব

জুম্মার দিনের প্রতিটি ইবাদতের রয়েছে স্বতন্ত্র ফজিলত। এই দিনে সূরা কাহফ পাঠ করা সুন্নত, কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুম্মার দিন সূরা কাহফ পড়বে, তার জন্য দুই জুম্মার মধ্যবর্তী সময় নূরময় হয়ে যাবে।” (বায়হাকী) এছাড়া এই দিনে বেশি বেশি দরূদ শরীফ পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবী করীম (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পড়ে। জুম্মার দিন তোমরা আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পড়ো, কেননা এ দিনে দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।” (আবু দাউদ) জুম্মার দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যাতে কোন মুসলিম বান্দা দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। অধিকাংশ আলিমের মতে এ সময় আসর থেকে মাগরিবের মধ্যে অথবা ইমামের খুতবার সময়। এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে উম্মতকে সতর্ক করেছেন এবং দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

তৌফিক সুলতান

গোসল, সাজসজ্জা ও মসজিদে আগমন

জুম্মার দিন গোসল করা ওয়াজিবের কাছাকাছি সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জুম্মার দিন প্রত্যেক মুসলিমের উপর গোসল করা আবশ্যক।” (বুখারী) এই গোসলের মাধ্যমে যেমন শারীরিক পবিত্রতা অর্জিত হয়, তেমনি আত্মিক পবিত্রতাও লাভ করা যায়। এছাড়া উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মিসওয়াক করা— এসব জুম্মার দিনের বিশেষ সুন্নত। মসজিদে আগমনের সময় ধীরে ধীরে, শান্তভাবে এবং প্রথম দিকে আগমন করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি জুম্মার দিন প্রথম ঘণ্টায় মসজিদে আসে, সে যেন একটি উট কুরবানী করল। দ্বিতীয় ঘণ্টায় আসলে যেন একটি গাভী, তৃতীয় ঘণ্টায় আসলে যেন একটি শিংওয়ালা দুম্বা, চতুর্থ ঘণ্টায় আসলে যেন একটি মুরগী এবং পঞ্চম ঘণ্টায় আসলে যেন একটি ডিম দান করল।” (বুখারী) এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, জুম্মার নামাজের জন্য আগাম আগমন কতটা সওয়াবের কাজ।

সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য উদাহরণ

জুম্মার নামাজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত। সপ্তাহে একবার সব শ্রেণির মুসলিম— ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত, উচ্চ-নিন্ম সকলেই এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। এই সমাবেশ পারস্পরিক পরিচয়, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করে। খুতবার মাধ্যমে ইমাম সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, ইসলামের নির্দেশনা এবং নৈতিকতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এটি এক ধরনের সাপ্তাহিক প্রশিক্ষণ, যা মুসলিম সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জুম্মার নামাজ শেষে ছোট-বড় সবার মিলনমেলা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। এই দিনটি ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে কিছু সময় বিরত থেকে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হওয়ার শিক্ষা দেয়, যা মানুষকে পার্থিবতার গ্লানি থেকে মুক্ত করে।

আধুনিক যাপনে জুম্মার চেতনা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে জুম্মার দিনের গুরুত্ব যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক মুসলিম অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের চাপে জুম্মার নামাজকে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারছেন না। অথচ ইসলাম জুম্মার নামাজের জন্য সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পার্থিব কাজকর্ম সাময়িক স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! জুম্মার দিন যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর।” (সূরা জুম্মা: ৯) এটি শুধু ধর্মীয় নির্দেশনাই নয়, বরং সাপ্তাহিক এক বিরতি যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে। জুম্মার দিনকে কেন্দ্র করে পরিবার পরিজন নিয়ে সময় কাটানো, শিশুদের মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত করা, আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া— এসব আজকের যুগে অত্যন্ত জরুরি। জুম্মার দিনের চেতনা যদি আমরা সঠিকভাবে আত্মস্থ করতে পারি, তাহলে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে এসে যাবে বিরামহীন বরকত। আল্লাহ তাআলা আমাদের জুম্মার দিনের হক আদায় করার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

লেখক: শিক্ষক & প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!