বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নিরাপদ সড়ক এখনো অধরা স্বপ্ন

Author

মোঃ রবিউস সানি জোহা , Islamic University

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৯৬ বার

বাংলাদেশ আজ এক দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। উন্নয়নের বহুমাত্রিক সূচক, দৃশ্যমান অবকাঠামোগত প্রসার, আধুনিক সড়কব্যবস্থার বিস্তার সবকিছু মিলিয়ে একটি উদীয়মান অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির বিপরীতে এক নির্মম বৈপরীত্য ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। উন্নয়নের এই মহাসড়কই যেন প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয়ে উঠছে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মাধ্যমে। প্রতিদিনের খবরের কাগজ, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই ছড়িয়ে আছে দুর্ঘটনার করুণ চিত্র, যেখানে সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ভাঙা স্বপ্ন, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সম্ভাবনা এবং শোকাভিভূত পরিবারগুলোর নীরব আর্তনাদ।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ৪৯৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৬৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং আহত হয়েছিলেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৩৬টিতে এবং প্রাণহানির সংখ্যা পৌঁছে যায় ৮ হাজার ৪৭৮ জনে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে এক গভীর জাতীয় সংকেত বহন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১.১৯ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় এবং ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র আরও উদ্বেগজনক কারণ এখানে নিহতদের একটি বড় অংশই দেশের কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে তা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ত্রুটির ফল নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের অসচেতনতা, অদক্ষতা এবং বেপরোয়া মনোভাব সরাসরি দায়ী। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই কিংবা অপ্রতুল দক্ষতা নিয়ে যানবাহন পরিচালনা করেন। লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকায় অযোগ্য ব্যক্তিরাও সহজেই সড়কে নামতে পারছেন। ফলে সড়ক নিরাপত্তা একটি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেক বা স্টিয়ারিংয়ের সমস্যা কিংবা পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—সবকিছু মিলিয়ে এই যানবাহনগুলো রাস্তায় চলমান মৃত্যুফাঁদে রূপ নিচ্ছে। পাশাপাশি দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত সড়ক নকশা, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতা দুর্ঘটনার ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবহন খাতের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের উপস্থিতিও এই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন খাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকার অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়, যা বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টিত হয়। এই অর্থনৈতিক স্বার্থের জাল ভেঙে না দিলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রণীত আইনও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে, ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সমস্যা গভীরভাবে প্রোথিত। পথচারীদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা কম, ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে অনীহা দেখা যায়। একইভাবে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা এবং দ্রুতগতির প্রতি আকর্ষণ দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। নৈতিকতা ও সচেতনতার এই ঘাটতি সড়ক নিরাপত্তাকে একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতায় রূপান্তর করেছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে গেলে তার পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়ে, যা অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের চক্রকে আরও জটিল করে তোলে। একইসাথে আহতদের চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতার ক্ষতি এবং কর্মঘণ্টার অপচয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে একটি দেশের জিডিপির প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য কী? যদি সেই উন্নয়নের পথে মানুষের জীবন নিরাপদ না থাকে, তবে সেই অগ্রযাত্রা কতটা অর্থবহ? সুতরাং, এখনই সময় এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার। চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা ছাড়া এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা জাগ্রত করাও সমানভাবে জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, উন্নয়নের মহাসড়ক তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন তা হবে নিরাপদ, মানবিক এবং টেকসই। অন্যথায় এই অগ্রগতির পথই একসময় আমাদের জন্য পরিণত হবে শোক, বেদনা এবং অপূরণীয় ক্ষতির এক অন্তহীন অন্ধকারে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!