বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

এক কার্ডেই সব সেবা সময়ের দাবিতে সমন্বিত নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থা 

Author

তৌফিক সুলতান , ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ: ১ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৪৫ বার

তৌফিক সুলতান (মোঃ তৌফিক হোসাইন)

রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একজন সাধারণ নাগরিককে আজ নানা ধরনের কার্ডের বোঝা বহন করতে হয়। তেল কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, টিসিবি (TCB) কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড—প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা পরিচয়পত্র, আলাদা নিবন্ধন, আলাদা প্রক্রিয়া। ফলে সেবা পেতে গিয়ে মানুষকে পোহাতে হয় দীর্ঘ ভোগান্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কখনো কখনো দুর্নীতির শিকারও হতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর সমাধান হতে পারে—সব ধরনের সেবা ও সুবিধাকে একটি একক স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল রূপান্তরের পথে অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত NID Smart Card প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত এবং বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী। এই কার্ডকে কেন্দ্র করে যদি তেল বিতরণ ব্যবস্থাপনা, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি, কৃষি ভর্তুকি, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB)-এর ন্যায্যমূল্যের পণ্য বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একত্রিত করা যায়—তাহলে একটি সমন্বিত ও দক্ষ সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি কার্ডে সব সেবা অন্তর্ভুক্ত করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাওয়া। বর্তমানে একই ব্যক্তি একাধিক কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণের সুযোগ পায়, যা অনেক সময় অপব্যবহার ও দুর্নীতির জন্ম দেয়। কিন্তু যদি সব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংযুক্ত থাকে, তাহলে একজন ব্যক্তি ঠিক কতটুকু সুবিধা পাচ্ছে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে করে প্রকৃত উপকারভোগীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিতভাবে পাবে এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমে আসবে।

এছাড়া, এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আলাদা আলাদা কার্ড তৈরি, বিতরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সময় ও শ্রমও সাশ্রয় হবে। একটি কার্ড দেখিয়েই একজন কৃষক তার ভর্তুকি পেতে পারেন, একজন নিম্নআয়ের পরিবার ন্যায্যমূল্যের পণ্য সংগ্রহ করতে পারে, আবার একই কার্ড ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে—এমন একটি সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি কার্ডে যদি নাগরিকের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তবে সেটি সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই উন্নতমানের এনক্রিপশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যাতে এই সেবা নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পারে। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে একক ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে, যা প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশও যদি এই পথ অনুসরণ করে, তবে তা হবে “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়ার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

“এক কার্ডেই সব সেবা”—এটি কেবল একটি ধারণা নয়, বরং সময়ের দাবি। তেল কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, TCB কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড—সবকিছুকে একটি সমন্বিত স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা গেলে নাগরিক জীবনে আসবে স্বস্তি, সেবায় আসবে গতি, আর রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত হবে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সর্বোপরি—জনকল্যাণে অটল প্রতিশ্রুতি।

লেখক: শিক্ষক & প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক অনুসন্ধান - Dainik Anusandhan News Portal - দৈনিক অনুসন্ধান নিউজ পোর্টাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!