বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নারী শক্তি : সমাজের অগ্রগতির চালিকাশক্তি

Author

Nayma Sultana, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৫ বার

নারী শিক্ষা : সমাজের অগ্রগতির চালিকাশক্তি
নাঈমা সুলতানা

সভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় নারী শুধুমাত্র একটি সামাজিক পরিচয়ের নাম নয়; বরং নারী সৃজনশীল শক্তি, সংস্কৃতির ধারক এবং ভবিষ্যত লালনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুঘটক। পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহৎ সকল সামাজিক রূপান্তর, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার বা মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটেছে,তার গর্বিত অংশীদার হিসেবে নারী সবসময়ই উপস্থিত। তাই “নারীর শক্তি, সমাজের আলোর দিশা”- এটি নিছক কোনো অলঙ্কারধর্মী বাক্য নয়, সভ্যতার ইতিহাস ও ধরিত্রীর বাস্তবতার গভীরতম সত্য।
বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন নব মাত্রা পেয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। কিন্তু এই একটি দিনের উদযাপন দিয়ে নারীর সংগ্রাম বা অবদানকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। আজকের দিনটি মূলত নারীত্বের সেই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক, যেখানে নারীরা অবহেলা, বৈষম্য ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন কালক্রমে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই আমরা দেখতে পাই- নারী কেবল অনুপ্রেরণার প্রতীক নন, তিনি সৃষ্টির সক্রিয় নির্মাতা। বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেরী কুরীর নাম এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর গবেষণা শুধু বিজ্ঞানের নতুন অধ্যায়ই সূচনা করেনি; বরং প্রমাণ করেছে যে জ্ঞান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও নারী অগ্রসর। প্রযুক্তির প্রারম্ভিক যুগে গণনা ও অ্যালগরিদমের ধারণাকে সুসংগঠিত করে ভবিষ্যতের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এ্যাডা লাভলেস। মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে সাহসিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছেন ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা, যিনি পৃথিবীর প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে মানবজাতির স্বপ্নকে মহাকাশের অসীমতায় পৌঁছে দেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইতিহাসে নারীর অবদান গভীরভাবে প্রোথিত। নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের অগ্রদূত হিসেবে বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এমনই হাজারো বিজয়লক্ষ্মী নারীর অবদানে আজকের এই উন্নত মানবসভ্যতা।
তবে নারীর শক্তির প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ইতিহাসের আলোচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রতিদিনের বাস্তবতায়, অগণিত অচেনা নারীর শ্রম, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যেই এই শক্তির প্রকৃত রূপ প্রকাশিত হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষাণী, কারখানার দীর্ঘ কর্মঘণ্টা পেরিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করা শ্রমজীবী নারী কিংবা সীমিত সুযোগের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে সংগ্রামরত মা,এরা প্রত্যেকেই সমাজের নীরব আলোকবর্তিকা। সংসার,মাতৃত্ব,সমাজ,প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, মহাকাশ ভ্রমণ – নারীর পৃথিবী এতটাই বিস্তৃত।
তথাপি করুণ বাস্তবতা হলো- নারীদের অগ্রগতির এই পথ এখনও পুরোপুরি বাধাহীন নয়। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে অসম সুযোগ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যাগুলো এখনও আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নির্মম অংশ। এই পরিস্থিতি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না,বরং এটি একটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। নারী দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়- নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই নির্মমতা দূর না করলে নারীর কণ্ঠ, সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ কখনোই সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র- সব স্তরে এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারীকে সম্ভাবনার উৎস হিসেবে দেখা হবে, প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নয়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা। কেননা, একজন শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জীবনই বদলান না,বরং তিনি একটি পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেন। পরিবারে শিশুর শিক্ষা,লালন-পালন,অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ- সবই নারীর সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত। নারীর নিজস্ব আয়- উপার্জন এবং সম্পদে প্রাপ্য অধিকার তাকে অর্থনৈতিক মুক্তি দেয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পরিবার ও সমাজে নারীর প্রতি সম্মান এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করার মানসিকতা নারীকে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা জোগায়। সামাজিক নিরাপত্তা নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য রোধে হাতিয়ারের কাজ করে, নারীকে অপ্রতিরোধ্য হতে শেখায়। নারীর নেতৃত্ব সমাজে মানবিকতার অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়। রাজনীতি, শিক্ষা বা সামাজিক উন্নয়নে নারীরা যুক্ত হলে নীতি নির্ধারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অধিক গুরুত্ব পায় এবং উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও সৃজনশীলতায় নারীর ভূমিকা সমাজকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে সমৃদ্ধ করে তোলে।
নারীর শক্তিকে মর্যাদা দেওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা স্বীকার করা। কারণ নারী যখন এগিয়ে যায়,তখন এগিয়ে যায় সভ্যতা, নারী আলোকিত হলে , সভ্যতার পথও আলোকময় হয়ে ওঠে। সেই আলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়- নারী কেবলমাত্র সমাজের অংশ নন, তিনি সমাজের আলোর দিশারী। নারী যখন শিক্ষিত, শক্তিশালী এবং মর্যাদাবান হন, তখন তিনি শুধু নিজের জীবন নয়- সমগ্র সমাজকে নিরাপত্তা, জ্ঞান এবং মানবিকতায় সমৃদ্ধ করেন।
নারীর মুক্তি মানে কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়; বরং একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক জাগরণ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রত্যাশা – নারীর সৃষ্টিশীলতা এবং নেতৃত্বের শক্তি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে- হয়ে উঠুক সামষ্টিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি,আলো ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের সর্বস্তরে। সুলতানারা অবরোধবাসিনী না হয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখবে, সগৌরবে বাঁচবে !

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে ক্যাম্পাস রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!