ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়ে ভাবছি তো?

ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়ে ভাবছি তো?
নাঈমা সুলতানা
নদীমাতৃক যে জনপদের আত্মপরিচয় রচিত হয়েছে জলরাশির অবিস্মরণীয় প্রাচুর্যে, সেই বাংলাদেশে আজ পানির সংকটের কথা বলা এক নিদারুণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কিন্তু এই বৈপরীত্যই আজ আমাদের পানিসম্পদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কঠোর সতর্কবার্তা দিচ্ছে। একদিকে হিমালয়-বিধৌত নদ-নদীর দৃশ্যমান জলজ ঐতিহ্য, অন্যদিকে মাটির গভীর তলদেশে নীরবে সরে যাওয়া পানির স্তর—বাংলাদেশ আজ এ দুই বিপরীত মেরুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাই প্রতিবছর ২২ মার্চ যখন ‘আন্তর্জাতিক পানি দিবস’ পালিত হয়, তখন তা কেবল পঞ্জিকার পাতায় একটি চিহ্নিত দিন হিসেবে নয়; বরং আমাদের ত্রুটিপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং এক অদৃশ্য ‘স্লো-অনসেট ক্রাইসিস’ বা ধীরগতির সংকটকে নতুন করে অনুধাবনের একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
পানির এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর প্রচ্ছন্ন প্রকৃতি। এটি কোনো ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো আকস্মিক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে আসে না; বরং সময়ের স্তরে স্তরে মাটির গভীরে পুঞ্জীভূত হয় এবং একসময় সমাজ, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বহুমাত্রিক চাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিদিনের উত্তোলন প্রাকৃতিক পুনঃভরাটের (natural recharge) সীমা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি এক অদৃশ্য পতন, যা আমাদের পায়ের নিচের মাটিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। মাটির স্তরে পানির এই শূন্যতা দীর্ঘমেয়াদে ভূমিধস বা ভূমি বসে যাওয়ার (land subsidence) মতো ভয়াবহ ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। আমরা যখন ওপরের দিকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা তুলে অগ্রগতির জয়গান গাইছি, তখন মাটির নিচে আমাদের অস্তিত্বের আধারটিই ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নয়নের আগ্রাসী দর্শনের প্রশ্ন। গত চার দশকে কংক্রিটের অরণ্য বিস্তারে আমরা ভরাট করেছি হাজার বছরের পুরোনো খাল, বিল ও জলাভূমি। ঢাকা শহরের ভেতরে থাকা বহু খাল আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় কিংবা মানচিত্রের ধূসর রেখায় সীমাবদ্ধ। যে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে জলস্তরকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা ছিল, সেই স্বাভাবিক প্রবাহ আমরা রুদ্ধ করেছি পিচ ও সিমেন্টের আস্তরণে। ফলে বৃষ্টির পানি এখন আর মাটির সম্পদ না হয়ে শহরের জন্য ‘জলাবদ্ধতা’ নামক অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
সাতক্ষীরা, খুলনা বা কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এক কলস বিশুদ্ধ পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেওয়া নারীদের কষ্ট আমাদের উন্নয়নের গল্পের পেছনের এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সেখানে পানি কেবল তৃষ্ণা নিবারণের উপাদান নয়; বরং তা নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পথে এক বিশাল অন্তরায়
শিল্পায়নের বিস্তারও এই সংকটে অনুঘটকের ভূমিকা রাখছে। একদিকে কলকারখানাগুলো সীমাহীনভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে, অন্যদিকে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত জলাশয় ও নদীতে নিঃসরণ করছে। ফলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা শীতলক্ষ্যার পানি আজ শুধু ব্যবহারের অযোগ্যই নয়; বরং প্রাণহীন এক কালো প্রবাহে পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের এক ভয়াবহ ‘রিসোর্স ট্র্যাপ’ বা সম্পদ-ফাঁদে আবদ্ধ করেছে। যখন ওপরের পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ নিরুপায় হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এই চক্র আমাদের সামগ্রিক জলজ বাস্তুসংস্থানকে স্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পানিসংকটের একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে, যা আধুনিক সমাজতত্ত্বে ‘জলরাজনীতি’ (hydro-politics) নামে পরিচিত। পানি এখন আর কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি ক্রমেই একটি নিয়ন্ত্রিত সম্পদে পরিণত হচ্ছে, যার বণ্টন নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ক্ষমতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে। শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এলাকায় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও তৎপরতা দেখা যায়, তার সামান্য অংশও পৌঁছায় না প্রান্তিক বস্তি এলাকা কিংবা দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই বৈষম্য আরও নির্মম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানি স্থলভাগের মিঠা পানির উৎসগুলোকে গ্রাস করছে। সাতক্ষীরা, খুলনা বা কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এক কলস বিশুদ্ধ পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেওয়া নারীদের কষ্ট আমাদের উন্নয়নের গল্পের পেছনের এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সেখানে পানি কেবল তৃষ্ণা নিবারণের উপাদান নয়; বরং তা নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পথে এক বিশাল অন্তরায়। যখন পানির প্রাপ্যতা মৌলিক অধিকার না হয়ে ক্রয়ক্ষমতার বিষয়ে পরিণত হয়, তখন তা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের কাঠামো তৈরি করে।
ভূগর্ভস্থ জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় কেবল পরিমাণগত সংকটই তৈরি হচ্ছে না; দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ গুণগত ঝুঁকিও। পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় মাটির গভীরে থাকা আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতুর ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ‘টাইম বোমা’। আর্সেনিকোসিসের মতো রোগ, যা একসময় গ্রামবাংলায় মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিল, তা নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি করছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতও এই সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি সেচনির্ভর বোরো চাষ, যার বড় অংশই নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ ব্যয় বাড়ছে, যা সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যমূল্যে প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ, পানিসংকট কেবল তৃষ্ণার বিষয় নয়; এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন প্রথাগত চিন্তা ও কৌশলের মৌলিক পরিবর্তন। এটি কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; বরং একটি সামগ্রিক জীবনদর্শনের প্রশ্ন।
প্রথমত, পৃষ্ঠজলের পুনরুদ্ধার—নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুজ্জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দখলমুক্ত করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।
দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ—নগর পরিকল্পনায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও তা মাটিতে পুনঃরিচার্জের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা—‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি কার্যকর করতে হবে। ইটিপি (Effluent Treatment Plant) ছাড়া কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া মানেই ভবিষ্যতের পানিসম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
চতুর্থত, কৃষি কৌশলে পরিবর্তন—কম পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসলের চাষাবাদে জোর দিতে হবে এবং সেচে পৃষ্ঠজল ও সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, পানি ব্যবস্থাপনায় লাভ-ক্ষতির হিসাবের চেয়ে মানবিক অধিকার ও ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রান্তিক ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
তবে আশার কথা, ইতোমধ্যে দেশে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে—বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি, নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের আলোচনা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ধারণা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্থান করে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পানি সংকট এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়, যা পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ভূগর্ভস্থ পানির এই সংকট আমাদের সময়ের এক গভীর সতর্কবার্তা। এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; বরং আমাদের বর্তমান উন্নয়ন মডেলের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। আমরা যদি এমন এক অগ্রগতির কাঠামো নির্মাণ করি, যেখানে টিকে থাকার মৌলিক উপাদান ‘পানি’ই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে সেই অগ্রগতি নিজ ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ‘আন্তর্জাতিক পানি দিবস’ তাই নিছক প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটি হতে হবে এক জাতীয় আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি আমাদের যে পানির আমানত দিয়েছে, তার কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে পানির সুষম বণ্টন, সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারই হতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহার।

