বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

যাদের ঘামে দেশ বাঁচে, তাদের বাঁচাবে কে?

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১০৮ বার

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকরা শুধু খাদ্য উৎপাদনকারী নয় বরং দেশের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই চাষীরাই আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বর্তমান বাংলাদেশের চলমান পেয়াজ চাষীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে সে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সার্বিক পর্যালোচনা করে দেখা যায় পেঁয়াজচাষীদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় । বিশেষকরে বাংলাদেশের পাবনার সুজানগর, সাঁথিয়াসহ বেশ কিছু অঞ্চলের চাষীরা আজ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। কারণ এ অঞ্চলের চাষীদের সারা বছরের অধিকাংশ আয় নির্ভর করে এই পেঁয়াজ চাষের উপর। বলা যায়, বাংলাদেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের ২৫% থেকে ৩০% আসে শুধু পাবনা জেলা থেকে। যার মধ্যে সুজানগর অঞ্চলকে বলা হয় ‘পেঁয়াজের ভান্ডার’।

প্রতিবছর কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খরা-বৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে অকান্ত পরিশ্রম করে পেঁয়াজ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু এই অগাধ পরিশ্রম করে ফসল ঘরে তোলার পথে আজ কৃষকের মুখে হাসির বদলে রয়েছে হতাশা। যে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসল সারা বছর দেশের রসুইঘর সচল রাখে আজ ন্যায্য মূল্যের অভাবে সেই কৃষকেদের নিজের রসুইঘরে প্রায় আগুন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এমনি পেয়াজের হতাশাজনক মূল্যের কারণে, এত পরিশ্রমের  নিজের হাতে ফলিত ফসল নষ্ট করার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও দেখা গিয়েছে।
বাংলাদেশের পেঁয়াজ চাষিরা সাধারণত প্রান্তিক ও মাঝারি পর্যায়ের চাষী। পেঁয়াজ চাষের প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। বীজ সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে সার প্রয়োগ, সেচ প্রকল্প এবং পেঁয়াজ সংগ্রহ করা পর্যন্ত কৃষকদের স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীদের জন্য এ অর্থ জোগাড় করা বড়ই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা এনজিও, ব্যাংক বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ফলিত ফসল থেকে প্রাপ্ত আয় দ্বারা তারা সেই ঋণ পরিশোধ করে থাকে। কিন্তু এ বছরে কৃষকেরা পেঁয়াজের নায্যমূল্যের অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একদিকে কড়া ঋণের বোঝা অন্যদিকে কষ্টে ফলিত ফসলের উৎপাদন মূল্য পর্যন্তও উঠছে না। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যায়, পুরো বছরে একজন কামলা বা জনের বাজার দর ছিল প্রায় ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে বর্তমান পেয়াজের বাজারমূল্য ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা মণ। এমনকি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করেও পেঁয়াজের বাজার দেখা গিয়েছে। এক্ষেত্রে পুরো মৌসুমে পেঁয়াজের বীজ বপন থেকে উত্তোলন পর্যন্ত শুধু কামলা বা জন খরচের সাথে তুলনা করলেই পেঁয়াজ চাষীদের দুর্ভোগ স্পষ্ট বোঝা যায়। এছাড়াও প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীদের জমি ক্রয়ের বিষয়টিও তাদের হতাশার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার ইচ্ছা করলেই এই প্রান্তিক চাষীরা সংগ্রাহাগারের অভাবে এ ফসলগুলো সংগ্রহ করতে পারে না। অন্যদিকে চড়া ঋণের মরণফাঁদ দ্বারা মহাজনদের চাপ সৃষ্টির ফলে তারা এই ফসল স্বল্প দামে বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। ফলে চাইলেও তা সংগ্রহ করার উপায় থাকে না। যদিও বর্তমান বাজারমূল্যে কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বাজার মূল্য ৯০০-১৩০০ টাকা মণ বাজার দর দেখা যাচ্ছে। তবে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা মণ না হওয়া পর্যন্ত কৃষকের স্বস্তি নেই।
শুধু পেঁয়াজ নয়, যেকোনো ধরনের ফসলের ক্ষেত্রেই কৃষকরাই সবসময় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
চাষীদের লোকসানের আরেকটি বড় কারণ হলো বাজারের সিন্ডিকেট। যে কোনো ফসলের বাজারের ক্ষেত্রেই বড় পাইকার ও আরতদারদের চাপে হামেশাই হাটে কৃত্তিম দর পতন লক্ষ্য করা যায়। আরতদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা একজোট হয়ে কৃষকদের নায্যমূল্য দিতে অস্বীকার করে। এবারে দেখা গিয়েছে, দূর থেকে পেঁয়াজ আনার পরিবহন খরচের কথা বিবেচনা করে চাষিরা সেই মূল্যতেই বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। সিন্ডিকেট চক্র এভাবে চাষীদের ঠকিয়ে কমমূল্য পেঁয়াজ কিনে মজুূদ রাখে। চাষীদের পেঁয়াজ সংকট দেখা গেলে ধীরে ধীরে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা অধিক মূল্য তা বিক্রি করে। অর্থাৎ কষ্ট করে কৃষক আর মুনাফা লোটে সিন্ডিকেট। এছাড়াও তারা মৌসুমের শুরুতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে বা কারসাজি করে বিদেশি পেঁয়াজের আমদানির অনুমতি নিয়ে বাজার সরবরাহের জোয়ার তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে দেশি পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দিয়ে সেগুলো আবার নিজেরা সংগ্রহ করে ফুলেফেঁপে উঠে পরবর্তীতে অধিক দামে তা বিক্রি করে থাকে। যার ফলে শুধু চাষীরাই নিংস্ব হয় তা নয় সাধারণ ক্রেতারাও অধিক দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। অর্থাৎ মাঠের চাষী আর শহরের ভোক্তাদের মাঝে মধ্যসত্বভোগী ও আরতদাররাই বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে চাষী এবং ক্রেতা উভয়ই সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।
আরেকটি বিষয় যেটা দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান বেশি ফলন আর উৎপাদন খরচ তুলতে চাষীরা দেশি প্রজাতির পেয়াজের উপর আগ্রহ হারিয়ে বিদেশি জাতের পেঁয়াজ চাষের দিকে ঝুকে পড়ছে। যা দেশীয় পেঁয়াজের বিলুপ্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।
এছাড়াও নায্য মূল্যের অভাবে কৃষকেরা দিন দিন চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কৃষকদের চাষ বিমুখ মানে দেশের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার অশনিসংকেত। যা দেশের মেরুদন্ড অর্থাৎ মূল চালিকাশক্তি কৃষিখাতকে একসময় বিরাট হুমকির মুখে দাড় করতে পারে। আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং কৃষকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান বাজারমূল্যের এবং বাজার সিন্ডিকেটের দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে বড় বড় বাজার থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের বাজার মনিটরিং করে এবং অঞ্চলভিত্তিক প্রান্তিক চাষীদের ফসল সরবরাহের জন্য সংগ্রাহাগার স্থাপন করা আবশ্যক বলে মনে করছি। সর্বোপরি, কৃষকদের সার্বিক উন্নতির দিকে নজর দিয়ে তাদের হতাশা দূর করে তাদেরকে কৃষির প্রতি আরও বেশি উৎসাহী করে তুলতে হবে এবং কৃষি খাতকে আরো সম্ভাবনাময় করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!