বিশ্বকাপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
বিশ্বকাপ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি বৈশ্বিক উৎসবের আমেজ। একটি বা দুটি দেশ নয়, এটি যেন পুরো পৃথিবীর এক ভিন্ন রকম মিলনমেলা। চার বছর পর পর কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও উত্তেজনার মহোৎসব এই ফিফা বিশ্বকাপ। পৃথিবীর প্রত্যকটি কোণে কোণে, গ্রাম থেকে শহর, শিশু-তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণদের মধ্যেও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সকল অনুভূতি যেন একটি গোলপোস্টের মধ্যে জমা হয়। এই বৈশ্বিক সম্প্রীতির মধ্যে দিয়ে এইবারের আমেজটা আরো বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে। কারণ এবারের বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো ৪৮ টি দল মূল পর্বে অংশ নেওয়ার নতুন রেকর্ড গড়তে চলেছে। যেখানে পূর্বে ৩২ টি দলের সমাবেশ দেখা গিয়েছে। তবে এই আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন এটি সুষ্ঠু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন দলকে কেন্দ্র করে শহর-গ্রাম-গঞ্জে সমর্থক গোষ্ঠীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকরা একে অপরের বিরোধী দল হিসেবে গণ্য করে বিভিন্ন সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা গিয়েছে। এমনকি খেলায় হার-জিতকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার মতো ঘটনারও অসংখ্য নজির রয়েছে।এছাড়াও আবেগের বসে অনেক ব্যক্তিদের দেখা যায় নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে বিশাল পতাকার বা ভিন্ন রকম নজির দেখানোর চেষ্টা করে। যার ফলে একটিমাত্র শখ পূরণের জন্য একটা পরিবারকে নিঃস্ব হতে দেখা যায়। এই আসন্ন বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আবেগঘন বিভিন্ন ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোছাঃ ইসমা খাতুন।
বিশ্বকাপ হোক নান্দনিক ও প্রতিযোগিতামূলক:
শুরু হচ্ছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। যার অপেক্ষায় থাকে গোটা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীরা। বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ। এবারের বিশ্বকাপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা এই তিনটি দেশে অনুষ্ঠিত হবে। যার মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশের মানুষ একত্রিত হয় এবং খেলাধুলার মাধ্যমে এক ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয়। ফুটবলের ৯০ মিনিট যেন এক যুদ্ধের মতো। যেখানে চলে টিকে থাকার লড়াই, জয়ের লড়াই। আমি বিশ্বের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে আসন্ন বিশ্বকাপ নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় আমার জন্য ছিল এক স্মরণীয় মুহূর্ত। এবারও আমি আশা করি প্রিয় দল তাদের শিরোপা ধরে রাখার জন্য এক দারুণ প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল উপহার দিবে। নতুন ও তরুণ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে আর্জেন্টিনা দল যথেষ্ট শক্তিশালী আছে বলে আমার বিশ্বাস। তবে শুধু আর্জেন্টিনা নয় বাকি দলগুলোও তাদের লড়াকু মানসিকতা ও দক্ষতা দিয়ে দারুণ এক বিশ্বকাপ উপহার দেবে এমন আশা আমরা রাখতেই পারি এবারের বিশ্বকাপে। একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমি সবসময়ই চাই প্রতিযোগিতামূলক ও নান্দনিক ফুটবল দেখতে। তাই সব দলের প্রতি সম্মান রেখেই আমি আর্জেন্টিনার সাফল্য কামনা করি।
মো: আব্দুল্লাহ আল মুনাইম
শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
হৃদয়ে শুধু ব্রাজিল:
ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আসরের পর্দা উন্মোচিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এর মাটিতে। প্রতিবারের মতোই এবারও মূল আলোচনায় থাকবে ল্যাটিনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। এবারের আসরে শক্তিশালী দল হিসেবে আমি মনে করছি ব্রাজিলকে। ব্রাজিলের স্কোয়াড গুণী খেলোয়াড়দের দ্বারা পরিপূর্ণ। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো নেইমারের ফিরে আসাটা আর রদ্রিগোর বাদ পড়া টা একটা ধাক্কা। তবে ব্রাজিলের ডিফেন্স অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে মারকুইনহোস ও মাগালায়েসের দ্বারা। আর মিডফিল্ডের রাজা তো গুইমারেস আছে-ই। ব্রাজিলের সেরা আকর্ষণ ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, নেইমার ও রাফিনহা। এদের মাধ্যমে এবার ব্রাজিলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হবে। ব্রাজিল-কে আমি সবদিক থেকে সেরা মনে করছি। মার্কিনহোস এর নেতৃত্বে আমরা এই আসরে নতুন কিছু দেখবো অবশ্যই আশা রাখি। হেক্সা মিশন এইবার পরিপূর্ণ হবে-ই।
শিক্ষার্থী, সামিয়া ইসলাম রিথী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
ফুটবল বিশ্বকাপে শহর ও গ্রাম অঞ্চলের আমেজ :
ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শহর গ্রাম গঞ্জে অন্য রকম একটা আনন্দ। এর ভিতর সবথেকে হইহুল্লোড় করতে দেখা যায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ভিতরে। শহর, গ্রামে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের পতাকার সারি সারি লাইন, তার সাথে ব্রাজিল সমার্থকদেরও। এই সময় গ্রামে আয়োজন করা হয় বিবাহিত ও অবিবাহিত ফুটবল ম্যাচ। কিন্তু দুঃখের বিষয় এর ভিতরে কেউ আর্জেন্টিনার খেলা ও ব্রাজিলের খেলা নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে এক পর্যায়ে হাতাহাতিতেও চলে যায়, যার ফলে বড় বিপর্যয় নেমে আসে। ফুটবল বিশ্বকাপ থাকে একমাস কিন্তু এই দ্বন্দ্ব থাকে মাসের পর মাস বছরের পর বছর। গ্রামে তো এ নিয়ে তুমুল সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়। কিন্তু আমরা ভুলে যায় খেলা একটা আবেগ যা সময়ের সাথে সেটাও বিদায় নেই, তাই আমাদের উচিত খেলাকে শুধু বিনোদনের চোখেই দেখা।
শাকিল ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস,
কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ।
এক ট্রফির খোঁজে কোটি হৃদয়ের স্পন্দন:
২০১০ সালের জুন মাসের কথা। চারিপাশে বৃষ্টির মৌসুম। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। বিশাল পতাকা টানানো হলো বাড়ির সামনে। শুরু হলো বিশ্বকাপের উত্তেজনা। গ্রামের আনাচে কানাচে শুনতে পেলাম কাকা, থিয়াগো সিলভা, মার্সেলো দের মতো প্লেয়ারের নাম। হলুদ সবুজ জার্সি হয়ে উঠল আমার ভালোবাসা। তারপর কত দিন গেলো আর গোনা হয়নি। ভার্সিটি এলাম, কখনও রুয়েট এর টঙে আবার কখনও বা রাবির বাসে বসে প্রিয় দলকে নিয়ে কত বিতর্ক করেছি। ২০২৬ এর বিশ্বকাপ সামনে। এটাই হবে আমাদের জেনারেশনের প্রিয় খেলোয়াড়দের শেষ নৃত্য। আর তারপর আমরা হয়তো মেসি, ক্রিস্টিয়ানো ও নেইমারকে মাঠের বাইরে দেখব। তবে সে কথা যাক, সেলেসাওরা কি তাদের সেই চিরচেনা ছন্দ ও নান্দনিকতা ফিরে পাবে নাকি ইতালিয়ান ম্যানেজার ই হবে তাদের শেষ ভরসা। শেষ বিদায়ের বেলায় নেইমার তার জাদু কি দেখাতে পারবে? এই প্রশ্নগুলো এখন প্রচণ্ডভাবে নিজেকে ধরে আছে। তবু স্বপ্ন দেখি ,দেখি ট্রপি হাতে শেষ বিদায় নিতে নেইমারকে।
শিক্ষার্থী, মো: তাওহীদ হোসেন
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
মিশন হেক্সার লক্ষ্যে সেলেসাওরা:
ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও জ্বলে উঠতে প্রস্তুত পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তির ট্যাকটিক্যাল কৌশলে ব্রাজিল গতিশীল এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের দিকে ঝুঁকছে। গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ অ্যালিসন বেকারের সামনে রক্ষণভাগ সামলাবেন মার্কিনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস। উইংয়ে ভিনিসিয়ুস এবং রাফিনিয়ার গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিতে মূল ভূমিকা রাখবে। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারায়েসের পাসিং ও ক্যাসেমিরোর ডিফেন্সিভ কভারেজ দলকে ভারসাম্য দেবে। আক্রমণে এন্ড্রিক বা কুনিয়ার চতুর পজিশনিং বক্সে গোল করার সুযোগ তৈরি করবে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতা, নেইমার, লুইজ হেনরিখ মতো প্লেয়ার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া বেঞ্চে ডগলাস সান্টোস, দানিল্লো সান্টোস,ব্রেমার,ফাবিনহো ,লিও পেরেইরা, মার্তিনেল্লির মতো তারকারা থাকায় যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে সেলেসাওরা। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত দলটি আক্রমণাত্মক ও নান্দনিককোচের কৌশলী পরিকল্পনা এবং খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত ফর্ম জাদুতে ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের অপেক্ষায় কোটি কোটি সমর্থক।
শিক্ষার্থী, আজিজুর রহমান
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
বিশ্বকাপ ও শিক্ষাজীবন:
শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটা খেলা না, বরং আরও বেশি কিছু। শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বকাপ মানে প্রিয় দলের জার্সি পরে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা কিংবা চায়ের কাপে ঝড় তোলা, রাতের ঘুম হারাম করে প্রিয় দলের ম্যাচ দেখা। ক্লাস, টিউটোরিয়াল কিংবা সেমিস্টার ফাইনাল কিছুই যেন আটকাতে পারে না শিক্ষার্থীদের এই উন্মাদনাকে । সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা দেখা যায় হল কিংবা ক্যাম্পাসে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার মুহুর্তে। প্রিয় দলের জয়ে বাঁধভাঙ্গা উল্লাস আবার পরাজয়ে হতাশা সবাইকে একসূত্রে বেধে দেয়। তখন থাকে না কোনো সিনিয়র-জুনিয়র, ডিপার্টমেন্টের দ্বন্দ্ব। আবার এর উল্টো চিত্রের দেখাও মেলে। ভিন্ন দলের সমর্থনকারীদের বাঁকা চোখে দেখা, তর্ক-বিতর্ক এমনকি মারামারি মতো ঘটনাও ঘটে। তবে দিনশেষে এই বিশ্বকাপ আমাদের নিরস একাডেমিক জীবনে আনন্দ, উন্মাদনা এনে দেয়। তাই দলের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এই মৌসুমকে উদযাপন করবে এমনটাই প্রত্যাশা থাকবে।
ফাহমিদা ইয়াসমিন মায়েদা,
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
