বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

অপেক্ষা

Author

MD Moajjam Hussain, Sreemangal Govt College , Sreemangal Govt College

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৩২ বার

স্টেশনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা, চায়ের দোকানে বসে আছি। দ্যুলোক তখন নীলাভ আর সারি সারি মেঘে আচ্ছাদিত। বাতাসের শো শো আওয়াজ ব্যক্তি মনকে উৎফুল্ল করে তুলছিলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছগুলোতে পাখিদের কলতান আর প্রকৃতির ছন্দে পরিবেশ এক অন্যরকম সাজে সেজেছে আজ। সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই, সুর্য মামা ডুব দিয়েছে দিগন্তের অন্তে, আর একটু পরেই আঁধার হয়ে, গভীর রাত নেমে আসবে।

প্রকৃতির এই নীরব ছন্দে সবুজের ঘন আধার বন পেরিয়ে বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রাম থেকে সিলেট অভিমুখী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ভানুগাছ স্টেশন প্রবেশ করলো। ইঞ্জিন আর বগির তীব্র ঝন ঝনা ঝন আওয়াজ আশেপাশের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে।আর জ্বালানী দ্রব্যের ঝাঁঝালো গন্ধ, নাক কে আন্দোলিত করে তুলছিল। যখন ট্রেন পরিপূর্ণভাবে থেমে গেল, তাড়াহুড়ো করে একদল লোক ট্রেন থেকে নেমে গেলেন, ট্রেনের মধ্যে থাকা ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা ট্রেন পরিবর্তন করতে লাগল, বিষয়টা এরকম এতক্ষণ আমরা যে জায়গায় ছিলাম, যে মাধ্যমে ছিলাম, সেটি বর্তমানে আমাদের কোন প্রয়োজনই নেই। অন্যদিকে, স্টেশনে অপেক্ষারত অন্যান্য যাত্রীবৃন্দ কোনো রুপ দেরি না করে নিজেদের মালপত্র নিয়ে ট্রেনে উঠতে লাগলেন।

আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, একদল লোক নিজেদের গন্তব্যস্থল থেকে ফেরত এসেছে আবার একদল লোক নতুন কোন গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করছে। এতো এতো লোকজন, একই গন্তব্যে পথ চলা, তা সত্ত্বেও কেউই কারো খোঁজ নিচ্ছে না, কেউই কাউকে, “কেমন আছো?”একটিবার এটা জিজ্ঞাসা করার‌ও প্রয়োজন অনুভব করছে না, অথচ এরা প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনের কোন না কোন জায়গায় কোন একটি বিষয় নিয়ে মানসিক চাপের মধ্যে আছে। বিষয়টা এরকম হলেও পারতো, আমরা নিজেদের দুঃখ পরস্পর একে অন্যের সাথে বিনিময় করতাম, একটু খোঁজ নিতাম কেমন আছি, একটু পরস্পর একসাথে বসতাম, চা খেতাম, প্রয়োজনে বিলটা ও নিজের পকেট থেকে দিয়ে দিতাম, মন খুলে কথা বলতাম, সুখ-দুঃখ বিনিময় করতাম, আনন্দ ভাগ করতাম । এতে কিছুটা হলেও মন হালকা হতো। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এরকম হয়ে গেছে, আমরা সবাই একই পথে হাঁটছি, কিন্তু কেউই কারো ন‌ই।

কি হয়ে গেছে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের? আমরা কেন এখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি? এক‌ই গন্তব্যে এত লম্বা সময় ধরে সফর করার পরেও, কেন একটিবার আমাদের সফর সঙ্গী পাশে থাকা ব্যাক্তির খোঁজ নিচ্ছি না? কেন নিজের‌‌ প্রতিবেশী আশেপাশের মানুষ গুলোর খবর নিচ্ছি না? যারা দুঃখের মধ্যে আছে? কেন সেই সকল মানুষের খবর নিচ্ছি না, যারা অসুস্থ আছে, নিঃস্ব হয়ে গেছে, মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে আছে, আর্থিক অভাব অনটনের মধ্যে আছে, যার প্রাক্তন তাকে ছেড়ে হতাশ করে দিয়ে চলে গেছে, আমরা কেন একটি বার তার খবর নিচ্ছি না, সে কেমন আছে?।

কয়েক দশক পূর্বেও তো আমাদের এমন একটা প্রজন্ম ছিল, কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়,

“আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি,

যাদের পিঠে রক্ত জবার মতো ক্ষত ছিল”

এই সকল পূর্বপুরুষরাও তো ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, পথিমধ্যে দেখা হলে নিজেদের খোঁজখবর নিতেন, সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থাকতেন। ধর্ম-জাত সবকিছু ভুলে একে অন্যের বিপদ আপদে এগিয়ে আসতেন। তারাই তো ৪৭ এ ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক থেকে বাংলাকে মুক্ত করেছিলেন। একাত্তরের সেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন। আমরা সেই পূর্বপুরুষদের উত্তরসূরী হয়ে কেন এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেলাম? প্রশ্ন রইল বিবেকের কাছে।

ওইদিকে সূর্য মামাও দিগন্তের অন্তে ডুবে গেছে, পূর্ব আকাশে উজ্জ্বল চন্দ্র তার কিরণ বিচরণ করছে সর্বত্র। সে তার খুদে প্রচেষ্টা দিয়ে সূর্যের শূন্যতা পুরণ করে আলোকিত রেখে পৃথিবীকে নিয়ম তান্ত্রিকভাবে সমতা বজায় রেখে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মানুষ? নির্দিষ্ট সময় পর ট্রেন‌টাও তার বিরতিস্থল ত্যাগ করে, নতুন আরেকটি গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করলো, পথিমধ্যে কিছু লোককে বের করে দিল আর নতুন কতিপয়কে সংযুক্ত করে নিল নিজের দেহে।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!