বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ : কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ২১ বার

বিশ্ব রাজনীতি কখনো শূন্যতায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, নতুন শক্তির জন্ম হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বলয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বলয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে। যুদ্ধের পরিবর্তে চলেছিল প্রক্সি যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মহাকাশ প্রতিযোগিতা এবং মতাদর্শিক লড়াই। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন ইতিহাসের সেই দ্বন্দ্ব শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে উদার গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পশ্চিমা মূল্যবোধই হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়।

 

গত দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতি আবার এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা নতুন এক মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে। তবে এই মেরুকরণ আগের মতো সাদা-কালো নয়। এখন কোনো রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে না। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, সমুদ্রপথ, এমনকি তথ্যপ্রবাহও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ফলে বিশ্ব আজ এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে একই সঙ্গে একাধিক বলয় তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিটি বলয় নিজস্ব স্বার্থ, কৌশল ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণের চেষ্টা করছে।

 

বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও আর্থিক শক্তি। ডলারের আধিপত্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব, ন্যাটো জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু সেই নেতৃত্ব এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব, ব্রিকসের সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

 

চীন এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। চীন বুঝেছে, একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের চেয়ে অর্থনীতি অনেক বড় অস্ত্র। তাই তারা বন্দুকের আগে বন্দর নির্মাণ করেছে, সৈন্য পাঠানোর আগে রেললাইন নির্মাণ করেছে, যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আগে ঋণ ও বিনিয়োগ পাঠিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে যে অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, সেটি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও একটি কৌশল। চীনের এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে শুরু হয়েছে বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তিযুদ্ধ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা।

 

এই প্রতিযোগিতার মাঝখানে রাশিয়াও নিজের হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক শক্তির রাজনীতি এখনও শেষ হয়ে যায়নি। একই সঙ্গে ইউরোপ বুঝেছে, নিরাপত্তা ও জ্বালানির প্রশ্নে অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে বিশ্বে নতুন নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হচ্ছে, পুরোনো জোট আরও সক্রিয় হচ্ছে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নতুন মেরুকরণ কেবল রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা নয়; এটি বলয় বনাম বলয়ের প্রতিযোগিতা। একদিকে ন্যাটো, জি-৭ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারত্ব; অন্যদিকে ব্রিকস এবং চীনের অর্থনৈতিক প্রভাববলয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও নিজেদের স্বার্থে নতুন সমীকরণ গড়ে তুলছে। ফলে একটি রাষ্ট্র একই সময়ে একাধিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, আবার একই সঙ্গে একাধিক বলয়ের চাপও মোকাবিলা করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি তাই আজ আর সরল সমীকরণ নয়; এটি বহুস্তরীয় স্বার্থ, কৌশল ও প্রতিযোগিতার জটিল দাবার বোর্ড।

 

এই দাবার বোর্ডে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ এখন শুধু একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; এটি ক্রমেই একটি কৌশলগত রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। আর এখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। দীর্ঘদিন এই নীতি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ছিল, কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকলেও ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য কিছুটা কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা সেই স্বাধীনতার পরিসরকে সংকুচিত করছে। এখন বড় শক্তিগুলো শুধু বন্ধুত্ব চায় না; তারা কৌশলগত অবস্থানও চায়। তারা শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার খোঁজে না; বরং তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কারা পাশে থাকবে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে নিরপেক্ষ থাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আবার তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বঙ্গোপসাগর আজ শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, নৌ-নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই অঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে যে রাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, সে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারবে। এই কারণেই বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে।

 

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে একটি উন্মুক্ত, নিরাপদ এবং নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলছে। এই কৌশলের পেছনে শুধু নিরাপত্তা নয়, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সীমিত করার লক্ষ্যও রয়েছে। অন্যদিকে চীন বঙ্গোপসাগরকে তার সামুদ্রিক সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণে চীনের বিপুল বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কও গড়ে তুলছে। ফলে বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দুই পরাশক্তির স্বার্থ একই ভূখণ্ডে এসে মিলিত হয়েছে।

 

ভারতের অবস্থান আরও ভিন্ন। বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রতিবেশী নয়; দুই দেশের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বিদ্যুৎ সংযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ এবং গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ভারতও চায় বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে থাকুক। অর্থাৎ একই ভূখণ্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল কাজ করছে।

 

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, অর্থনীতি একদিকে, কূটনীতি আরেকদিকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় অংশ আসে পশ্চিমা বাজার থেকে। যদি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কোনো কারণে এই বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়, তবে দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। আবার একই সময়ে বাংলাদেশের বহু মেগা প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীন ও রাশিয়ার বিনিয়োগ রয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের জন্য চীন ও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ, আর রপ্তানির জন্য পশ্চিমা বিশ্ব অপরিহার্য। এই দ্বৈত বাস্তবতাই বাংলাদেশের কৌশলগত সংকটের মূল।

 

এই সংকটকে আরও জটিল করেছে প্রযুক্তিগত মেরুকরণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু বাণিজ্য বা সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, 5G নেটওয়ার্ক, সেমিকন্ডাক্টর, ক্লাউড অবকাঠামো এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি কোনো একটি প্রযুক্তিগত মানদণ্ড গ্রহণ করে, তবে সেটিও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কূটনীতি শুধু রাষ্ট্রদূতদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রযুক্তি নীতিও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

 

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি শিক্ষা নিয়ে এসেছে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি যুদ্ধ কীভাবে বাংলাদেশের খাদ্য, জ্বালানি, সার, গম, ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা এই যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক মেরুকরণ এখন আর দূরের কোনো কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাজারে চালের দাম, বিদ্যুতের খরচ, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়; সবকিছুই আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

 

এই কারণেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কোনো একটি বলয়ের অংশ হবে, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করবে? বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় পথটিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। কারণ একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে হারানোর ঝুঁকি নেওয়া বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই আজ বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি বলয়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যাতে কোনো প্রতিযোগিতার দাবার গুটিতে পরিণত না হয়ে বরং নিজের কৌশলগত গুরুত্বকে দেশের উন্নয়নের পক্ষে ব্যবহার করা যায়।

 

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলে, পরাশক্তির দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় মাঝারি ও ছোট শক্তির রাষ্ট্রগুলোকে। তারা যুদ্ধ শুরু করে না, কিন্তু যুদ্ধের অভিঘাত তাদের অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতিকে নাড়া দেয়। তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের শিল্পকারখানা বন্ধ হয়, জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। বর্তমান বৈশ্বিক মেরুকরণও সেই একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, আজকের সংঘাত আর কেবল সীমান্তে বন্দুকের গর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রযুক্তির অ্যালগরিদমে, আর্থিক নিষেধাজ্ঞায়, বাণিজ্যনীতিতে, সাইবার জগতে এবং তথ্যপ্রবাহের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অর্থ এখন শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে তিনটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, কোনো পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত না হয়ে সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নির্ভরতার বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা, যাতে একটি বাজার বা একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা জাতীয় ঝুঁকিতে পরিণত না হয়। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও নিজস্ব সক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্মান পায় সেই রাষ্ট্র, যার অভ্যন্তরীণ ভিত্তি শক্তিশালী।

 

সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নতুন বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং প্রজ্ঞা, ভারসাম্য ও দূরদর্শিতা দিয়ে পথ চলতে হবে। কারণ পরাশক্তিরা তাদের স্বার্থেই বন্ধুত্ব করে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী দায়িত্ব হলো নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর,আমরা কি অন্যের কৌশলের অংশ হব, নাকি নিজেদের কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করব? ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব, দক্ষ কূটনীতি, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং এমন একটি রাষ্ট্রদর্শন, যা পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক মেরুকরণের যুগে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে দেশ কোনো বলয়ের অন্ধ অনুসারী হবে না; বরং নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথই উন্মুক্ত।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!