বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

এআইঃ নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার কৌশলগত অংশীদার

Author

মোহাম্মদ নাঈম মিজি , University of Chittagong

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৬ বার


ডিজিটাল দুনিয়ায় উন্নত দেশের উপর বেড়েছে সাধারণ দেশের নির্ভরশীলতা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত নীতিমালার  ফলে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি নতুন মেরুকরণের সম্মুখীন হবে। যেমন, চীনা এআই ও মার্কিন এআই বিশ্ব।


 

২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করার মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন সামরিক যুদ্ধের সূচনা হয় কিন্তু তার একদিন আগে ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সাইবার হামলা চালায় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক তথ্যের এক্সেস নিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় ডিজিটাল যুদ্ধ। সামরিক যুদ্ধ নিয়ে যতটা আলোচনা হয় সেই হিসেবে   তুষের আগুনের উত্তাপ ছড়ানো ডিজিটাল যুদ্ধের আলোচনা থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তড়ালে । আর এআই হচ্ছে এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। বিশ্ব স্নায়ুযুদ্ধের মতো উত্তপ্ত পরিবেশের সম্মুখীন হতে চলেছে এই এআই যুদ্ধের মাধ্যমে যা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান । রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে মাইক্রোসফট এর নাম উঠে  আসে কিন্তু সামরিক যুদ্ধে টেক কোম্পানির নাম অস্বাভাবিক লাগলেও তা বিশ্বে যে দ্রুত ডিজিটাল গ্লোবালাইজেশোন বৃদ্ধি পাচ্ছে   তার ইঙ্গিত দিচ্ছে ।  মাইক্রোসফট ইউক্রেনকে এক বছর যাবদ ডিজিটাল নিরাপত্তা দিয়েছে । ডিজিটাল গ্লোবালাইজেশনের ফলে অর্থনৈতিক বাজারের মতো ডিজিটাল দুনিয়ায় বেড়েছে মানুষের সম্পৃক্ততা কিন্তু তার নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্বের সকল দেশ সম-সক্ষমতা অর্জন করেনি। যার দরুন ডিজিটাল দুনিয়ায় উন্নত দেশের উপর বেড়েছে সাধারণ দেশের নির্ভরশীলতা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত নীতিমালার  ফলে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি নতুন মেরুকরণের সম্মুখীন হবে। যেমন, চীনা এআই ও মার্কিন এআই বিশ্ব।

 


ওয়াশিংটন যতই আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে চীনের প্রতি কিন্তু ততই যেন যুক্তরাষ্ট্রের অকার্যকরীতা দৃশ্যমান হচ্ছে । ওয়াশিংটনের একক সিদ্ধান্তে চলবে না কিছুই বেইজিং-এর সাথেও করতে হবে দর কষাকষি। যদিও ডিপসিক চ্যাটজিপিটির অপ্টিমাইজড ভার্সন হিসেবেই বেশি পরিচিত অর্থাৎ জিপিটি যা করতে পারে তাই ডিপসিক দ্রুত, অধিকতর নির্ভুল ও দীর্ঘ কমান্ডে কাজ করতে পারে তার বাহিরে নতুন কোনো ইনোভেশন নেই।


 

স্নায়ুযুদ্ধের সময় এপোলো প্রজেক্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটন প্রজেক্ট যেমন বিশ্ব আধিপত্য সৃষ্টি করার নিয়ামক ছিলো তেমনি ধারণা করা হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের উত্থান-পতন অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের উপর। শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এআই এর বিস্তৃতি যথারীতি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মাত্রা ও রূপ প্রদান করবে । পরাশক্তির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব শক্তির নিত্যতার সূত্র মেনে চলে সহজ ভাষায় বলতে গেলে,পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব কখনো শেষ হয় না শুধু ভিন্ন ভিন্ন রূপে চলমান থাকে । কখনো অর্থনৈতিক কখনো বাণিজ্যিক আর বহুল পরিচিত সামরিক যুদ্ধের রূপ সবারই চেনা । কিন্তু বর্তমান বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নীরবে নিভৃতে  চলমান যুদ্ধ হচ্ছে ডিজিটাল যুদ্ধ । আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  ডিজিটাল যুদ্ধে সম্মুখ সারির কমান্ডার হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে  যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ইঁদুর দৌড় শুরু হয়েছে তবে বর্তমানে হোয়াইট হাউজের ইউরোপ বিষয়ক সিদ্ধান্তে মহাদেশটির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কমন ভেল্যু বিনষ্ট হওয়া এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপকে সন্দেহের চোখে দেখায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একই ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়া ইউরোপের জন্য সুবিধাজনক নয় বিধায় যুক্তরাষ্ট্রের এআই ইকো-সিস্টেমে  মহাদেশটির না থাকার সম্ভাবনাই জড়ালো । আবার প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের এআই ইকো-সিস্টেমেও সংসার বাধা সম্ভব না। ফলে এই প্রতিযোগিতায় ইইউ স্বতন্ত্র এক প্রতিযোগী । যেখানে ইউরোপের অবস্থান অনেকটা কিন্ডারগার্টেন চাইল্ডের মতো । চীনা কোম্পানি টিকটকের মাধ্যমে  ডিজিটাল যুদ্ধের উত্তাপ  বিশ্বে আনুষ্ঠানিকতা অর্জন করে। এই অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও লোকেশন এক্সেস নিয়ে নিতো কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই। আর ডিজিটাল যুদ্ধের হাতিয়ারই হচ্ছে ব্যক্তির তথ্য । এছাড়াও আমেরিকা ও তার মিত্র ইউরোপ চীনের উপর এই অভিযোগ করে আসছিলো যে চীনের তৈরি সেমিকন্ডাক্টরের মাধ্যমে চীন তথ্য চুরি করে। আর বর্তমান ডিপসিকসহ ডিজিটাল প্লাটফর্ম “উই চ্যাট” ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চীনের ক্লাউডে স্টোরেজ থাকে আর চীনের কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারীদের তথ্য চীনা নীতি অনুযায়ী  সরকারকে দিতে বাধ্য থাকায় ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে বললে , যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা ইস্যু এর সাথে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র এ যাবৎকাল চীনের সাথে বৈরী সম্পর্ক প্রদর্শন করলেও তেমন কোনো আগ্রাসী মনোভাব দেখায়নি বরং কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্য করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রেসিডেন্টদের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত এবং প্রকাশ্যে চীনের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন করে। তাই  চীনের উপর শুল্ক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ঘোষণা দিয়ে আসছিলো তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই  কিন্তু  বেইজিং তার দূরদর্শী রাজনীতির মাধ্যমে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের কিছুদিন আগে ডিপসিক উন্মোচন করে। আর এটাকে ট্রাম্প আমেরিকার জন্য “জাগরনবার্তা” বলে অবহিত করেছে । বেইজিং-এর এমন আচরণ এটাই ইঙ্গিত করে যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় তারা চিন্তিত না । প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বাজারে চীন এখন আগের থেকে অনেক পরিণত ও দূরদর্শী।  অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এখন যে কার্যত অনেকটাই অকার্যকর হয়ে গিয়েছে তা স্পষ্ট । ওয়াশিংটন যতই আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে চীনের প্রতি কিন্তু ততই যেন যুক্তরাষ্ট্রের অকার্যকরীতা দৃশ্যমান হচ্ছে । ওয়াশিংটনের একক সিদ্ধান্তে চলবে না কিছুই বেইজিং-এর সাথেও করতে হবে দর কষাকষি। যদিও ডিপসিক চ্যাটজিপিটির অপ্টিমাইজড ভার্সন হিসেবেই বেশি পরিচিত অর্থাৎ জিপিটি যা করতে পারে তাই ডিপসিক দ্রুত, অধিকতর নির্ভুল ও দীর্ঘ কমান্ডে কাজ করতে পারে তার বাহিরে নতুন কোনো ইনোভেশন নেই। কেবল কম খরচে নিজেদের তৈরি চিপের সাহায্যে তা প্রস্তুত করতে পারে তা জানান দেয়াই ছিলো চীনের লক্ষ্য কিন্তু তাতেই ওয়াশিংটন এর মাইগ্রেনের ব্যথা হলেও সম্প্রতি ম্যানাস-এর আত্মপ্রকাশ-এ ওয়াশিংটনের চোখ যে কপালে উঠেছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায় সাথে ইউরোপেরও।

 

আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়া প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি পাতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক খবর প্রচারে ব্যস্ত। কারন টেক জায়ান্ট গুগল, অ্যাপল, মেটা, মাইক্রোসফট, এবং চিপ নির্মাতা এনভিডিয়াও কাড়িকাড়ি ডলার বিনিয়োগ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎকর্ষ সাধনে। চীন যেখানে মিলিয়ন ডলার খরচে অত্যাধুনিক চিপ নির্মাণ করতে পারে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর খরচ হয় বিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি এনভিডিয়া অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহারের চিপ উন্মোচন করে এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনোভেটএক্স তাদের নেক্সাসএআই নামের এআই উন্মোচন করে যা স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে অর্থনীতি পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পখাতে পরিবর্তন আনতে পারবে একিসাথে পাঁচগুণ দ্রুত ও অধিকতর নির্ভুল কাজ করতে সম্ভব । কম খরচে অত্যাধুনিক চিপ নির্মাণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে সহায়ক এবং সামাজিক প্লাটফর্মে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর পাশাপাশি , এআই এর মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য , ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করার পাশাপাশি  রাজনৈতিক দর্শন প্রচার সহজ এবং কার্যকরীভাবে সম্পন্ন করা যায় । যেমন ডিপসিক চীনা সরকারের সমালোচনা ও স্বার্থ পরিপন্থী তথ্য, ব্যবহারকারীকে প্রদান করে না। এছাড়াও উন্নত চিপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধাস্ত্র তৈরি একটি দেশকে সামরিক শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম । স্বয়ংক্রিয় যান (অটোনমাস ভেহিক্যাল), স্বয়ংক্রিয় ড্রোন (অটোনমাস ড্রোন), পর্যবেক্ষণ  , সাইবার যুদ্ধ, অটোনমাস উইপন , রক্ষণাবেক্ষণ ও রসদ ব্যবস্থাপনা,  সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা (সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট) ইত্যাদির মতো জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার  সাহায্যে স্বল্প সময়ে সহজে করার সম্ভব এছাড়াও যুদ্ধ ক্ষেত্রে জীবনহানি ও খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে।

তাই সময় গড়াবার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই খাতে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বের উন্নতি অগ্রগতির সাথে ডিজিটাল দুনিয়ায় বেড়েছে মানুষের সম্পৃক্ততা এবং নির্ভরশীলতা। ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে আছে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা কিন্তু পরাশক্তির দ্বন্দ্বে বরাবরই ডিজিটাল দুনিয়া ক্রমান্বয়ে হচ্ছে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের স্বার্থে ডিজিটাল প্লাটফর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত করায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধাস্ত্র তৈরি দিকে ধাবিত হওয়ায় বিশ্ব যে ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে তা মোকাবিলা করার ক্ষমতা বিশ্বে অন্যান্য দেশের না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতি নির্ভরশীল হবে এবং যার দরুন বিশ্ব খুব দ্রুতই নয়া মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে আর যেখানে সমরনায়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ।

 

—Mohammad Nayem | Mizee |

লেখক: Secretary for Literature and Publication, University of Chittagong || সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!