অচেনা ডিসেম্বর
অচেনা ডিসেম্বর
মনে পড়ে কি সেই দিনগুলোর কথা? বছর শেষে পড়াশোনার পাঠ গুটিয়ে নানুবাড়ি, দাদুবাড়ি ঘুরতে যাওয়ার সেই দিনগুলো? একরাশ আনন্দ, ইচ্ছা নিয়ে কাটানো সূক্ষ সময়। ডিসেম্বর মূলত শীতের আগমন। আর শীত মানেই আনন্দ। বিশেষ করে গ্রামের সকালে। ভোরের আলো মেখে সকালে ঘুম থেকে উঠে জ্যাকেট, চাদর গায়ে জড়িয়ে সবাই মিলে আগুনের তাপ পোহানো। উঠানে পিঁড়িতে বসে মায়ের বানানো ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, সাথে হরেক রকমের ভর্তা খাওয়া। নতুন ধানের চালের গুঁড়োয় তৈরি সে পিঠার স্বাদই আলাদা। পুকুরের ঠান্ডা পানিতে গোসল করে রোদের উষ্ণ তাপ গায়ে মাখা। রোদের মাঝে উঠানে বিছানো খড়ের ওপর বসে দুপুরের খাবার খাওয়া। বিকালে ছোট-বড় ভাই-বোন, মা, চাচিরা মিলে আড্ডা দেওয়া। মায়েরা একে অপরকে মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে সঙ্গে হাজারো গল্প। আর রাতের বেলা সবার প্রিয় ব্যাডমিন্টন খেলা। রাতের অন্ধকার যত গভীর হয় ব্যাডমিন্টন খেলার আনন্দ ততই যেন বাড়ে। উঠানে নেট টানিয়ে নেই ৩০ টাকার লাইটের আলোতে হতে থাকা কক-এর শব্দ যেন অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। যেন সারা বছরের সকল ক্লান্তি, চিন্তা, ব্যর্থতা পেরিয়ে এক নতুন দুনিয়ায় পৌঁছে গেছি আমরা।
সেখানে রয়েছে শুধুই আনন্দ। নেই কোনো চিন্তা, না আছে ব্যর্থতার ক্লেশ। কিন্তু সেই দিনগুলো আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ডিসেম্বর মাসটি প্রত্যেক বছর এলেও সেই আনন্দগুলো আজ অচেনা। যেন ধোঁয়াশের আড়ালে বিলীন হয়ে যায়। দিনের আলোতে যেমন ছায়া হারিয়ে যায়, তেমনি জীবন থেকে আনন্দগুলো হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির অতলে। নেই আনন্দ, নেই আগের মতো বাড়ি যাওয়ার তাড়া, নেই ভাই-বোনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়ার সময়। আমরা নিজেদের ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, চাকরি, দৈনন্দিন কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, নিজেকেই সময় দিতে পারি না। দিনের আলোতে কাজে মগ্ন থাকলেও রাতে অন্ধকার আমাদের একাকিত্বের সাক্ষী। সব পেছনে ফেলে সেই দিনগুলোতে পাড়ি দিতে মন চায়। মন চায় সময়গুলো ফিরে পেতে। কিন্তু সময় হয়ে ওঠে না। কারণ, সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময় তার নিজ গতিতে চলতে থাকে। হয়তো ঘড়ি থেমে যাবে, কিন্তু সময় থেমে থাকবে না। তাই বলব, সময়কে উপভোগ করতে শিখুন। পরে আনন্দ করব, টাকা হলে ঘুরতে যাব—এসব চিন্তা করলে চিন্তা আপনার পিছু ছাড়বে না। হয়তো পরে একসময় আপনি আনন্দ করার সময় পাবেন, কিন্তু প্রিয় মানুষ, বন্ধুগুলোকে পাবেন না। টাকা একদিন জমিয়ে ফেলবেন, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার মানুষ থাকবে না। তাই বলব, জীবনটা আপনার। সময়টা কাজে লাগান। যেন আফসোস শব্দটি আপনার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হতে না পারে।
