কেমোথেরাপি থেকে ক্যাম্পাস মশিউরের স্বপ্নজয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা মশিউর রহমানের মনে বাসা বেঁধেছিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। স্বপ্ন তার বড় হয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার। সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার সময় ধরা পড়ে প্রাণঘাতী ক্যানসার। হাসপাতালের বিছানায় একের পর এক কেমোথেরাপি ও যন্ত্রণাদায়ক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্রাচে ভর দিয়ে চলার দিনগুলো তার মনের জোরকে একচুলও টলাতে পারেনি। একসময় নিয়মিত ক্লাস করাই যেখানে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, সেই মশিউর থেমে যাননি পড়াশোনা থেকে। পটুয়াখালী থেকে একাই ঢাকায় গিয়ে কেমোথেরাপি নেওয়া, আবার একাই বাড়ি ফেরা, এভাবেই চলেছে তার লড়াই। তবে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটি আঁকড়ে রেখেছিলেন মশিউর। সেই স্বপ্নই আজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। একসঙ্গে দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন মশিউর। জগন্নাথ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন মশিউর।
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের সন্তান মশিউর রহমান। বাবা মো. শাহ আলম খলিফা একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, মা মরিয়ম বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষিকা। দুই বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে মশিউর সবার ছোট।
সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেই সন্তানদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি স্বপ্নপূরণে পাশে থেকেছেন বাবা-মা। মশিউর রহমান জানান, আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন থেকেই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা শুরু হয়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে যখন আমার সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল, তখন হঠাৎ ঠাণ্ডা-কাশি শুরু হয়। তবে কাশিটা যখন কমছিল না, তখন ঢাকাতে আসি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক বলেন, আমার ক্যানসার হয়েছে। বিশ^াসই হচ্ছিল না। কালক্ষেপণ না করে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের চেন্নাইয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে চলে যাই। সেখানে আবার নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সেখানেও একই ফলাফলে ক্যানসার ধরা পড়ে। আমাকে জানানো হয়, তোমার কেমোথেরাপি নিতে হবে।
মশিউর আরও বলেন, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে আমার প্রথম কেমোথেরাপি শুরু হয়। সেখানে থেকেই দীর্ঘ ১১ মাস আমার কেমো চলে।
পঞ্চম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষায় আমি জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। ভারতে থাকার কারণে আমি অষ্টম শ্রেণিতে নিয়মিত না হতে পেরে নবম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগেই ভর্তি হই। তবে নবম শ্রেণির প্রথমদিক থেকেও নিয়মিত ক্লাস করতে পারতাম না। কেমো নিতে নিয়মিত ঢাকাতে আসা-যাওয়া করা লাগত। এ যাত্রাটা আমার একারই ছিল। এভাবে দীর্ঘ আড়াই বছর কেমো চলাকালীন এসএসসি পরীক্ষা চলে আসে। ২৮ মে একটা কেমো ছিল, ৩০ মে আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়।
মশিউর জানান, চেন্নাইতে থাকাকালীন এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল জানতে পাই। এতে আমি ৪.৩৯ পাই। তখন থেকেই আমার এই জার্নিটাকে একটা পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করি। একাদশ শ্রেণির প্রথমদিক থেকেই একটু একটু করে বিশ^বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকি। এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং আল্লাহ আমাকে উত্তম ফল দান করেন। আমি জিপিএ-৫ অর্জন করি। একসঙ্গে বাংলাদেশের চারটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাই।
