সবুজ বাতি জ্বলে-নিভে, তবু কিছু বলা হয় না!
কিছু মানুষ জীবনে আসে গল্প হয়ে, কিছু মানুষ থেকে যায় স্মৃতি হয়ে। কিছু সম্পর্কের নাম না থাকলেও মনের ভেতর এমন এক জায়গা দখল করে নেয়, যেখান থেকে তাদের আর কখনো সরানো যায় না। সারার সঙ্গে ছেলেটার পরিচয় হয়েছিল ২০১৯ সালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দা পেরিয়ে শুরু হয়েছিল কথোপকথন। প্রথমে অল্প অল্প কথা, তারপর দীর্ঘ আলাপ। দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে একে অপরের খোঁজ নেওয়া, রাত গভীর হলে জমে থাকা গল্প বলা কখন যে সেই কথাগুলো ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল, দুজনের কেউই বুঝতে পারেনি। দূরত্ব ছিল, শহর আলাদা ছিল, কিন্তু মনের দূরত্ব ছিল না বললেই চলে। এভাবেই তিনটি বছর কেটে গেল। কখনো একসঙ্গে হাঁটার, কখনো একই আকাশের নিচে বসে গল্প করার, কখনো শুধু পাশাপাশি থাকার স্বপ্ন। কিন্তু সব গল্পের শেষটা মানুষের ইচ্ছে মতো লেখা হয় না। ২০২১ সালে সারার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেটার জীবনে সেদিন কোনো নাটকীয় দৃশ্য ঘটেনি। পৃথিবী থেমে যায়নি। সূর্য উঠেছিল, মানুষ কাজে বের হয়েছিল, শহরের রাস্তায় যানবাহনও চলেছিল। শুধু তার ভেতরে যেন একটি দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে তাদের ভালোবাসার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়নি। কোনো শেষ কথাও হয়নি। বরং জীবনই তাদের আলাদা করে দিয়েছিল। এরপরও কখনো কখনো দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। পুরোনো পরিচিতির মতো কিছু মুহূর্ত ফিরে এসেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দেখা-সাক্ষাৎও কমে গেল। তারপর কেটে গেল আরও কয়েক বছর। গত এক বছর ধরে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তবু ছেলেটার ফেসবুক খুললে কখনো কখনো অদ্ভুত এক অপেক্ষার তৈরি হয়। সারার নামটা চোখে পড়ে। সবুজ বাতি জ্বলে। কয়েক মুহূর্ত পর আবার নিভে যায়। ছেলেটা তাকিয়ে থাকে। মেসেঞ্জারের খালি ঘরটা খুলে আবার বন্ধ করে। কতবার যে মনে হয়েছে একটা ছোট্ট লেখা ‘কেমন আছ?’ লিখে পাঠাবে! তারপর আঙুল থেমে যায়। সারা এখন অন্য একটি সংসারের মানুষ। তার ছোট্ট মেয়েটিও নিশ্চয়ই আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সারা ফেসবুকে স্টোরি দেয়। ছেলেটি দেখে, চুপচাপ থাকে, আবার চলে যায়। কখনো একটি ছবির দিকে তাকিয়ে ছেলেটির মনে হয় মানুষ কি সত্যিই কাউকে ভুলে যায়? নাকি শুধু তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়? ভালোবাসা হয়তো সবসময় কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে দূরে দাঁড়িয়ে তার ভালো থাকা কামনা করা। রাফি জানে, সারার জীবনে তার জায়গাটা অনেক আগেই বদলে গেছে। আজও যখন ফেসবুকে হঠাৎ সেই সবুজ বাতিটা জ্বলে ওঠে, ছেলেটার বুকের ভেতর কোথাও যেন ২০১৯ সালের সেই ছেলেটা জেগে ওঠে। যে ছেলেটি জানত না ভালোবাসার সব গল্প পরিপূর্নতা পায় না। কিছু গল্প শেষ হয় একটি না-পাঠানো মেসেজে। একটি নিভে যাওয়া সবুজ বাতিতে। আর বুকের ভেতর আজীবন বেঁচে থাকা একটি নামের নীরবতায়। তারপর ফোনের পর্দা নিভে যায়। ছেলেটি ফোনটা পাশে রেখে দেয়। কিছু বলতে চেয়েও যেন আর কিছু বলা হয় না।
