রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

দ্বিজাতি তত্ত্বের বাইরে জিন্নাহ: এক নতুন রাজনৈতিক পাঠ

Author

মুহাম্মদ রিদুয়ান , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২২ বার

দ্বিজাতি তত্ত্বের বাইরে জিন্নাহ: এক নতুন রাজনৈতিক পাঠ

আমরা যখন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম শুনি, তখন আমাদের মাথায় একটাই কথা চলে আসে—“Urdu and Urdu shall be the only state language of Pakistan” ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে উচ্চারিত এই বক্তব্যের কারণে বাঙালির কাছে জিন্নাহর একটি বিশেষ পরিচয় তৈরি হয়েছে। কিন্তু আসলে কি একজন মানুষকে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বা একটি বক্তব্য দিয়ে পুরোপুরি বিচার করা যায়? জিন্নাহকে কি শুধু উর্দুর প্রশ্নে, কিংবা শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যথেষ্ট?

শৈলেশ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জিন্না পাকিস্তান : নতুন ভাবনা’ গ্রন্থের ভূমিকায় অন্নদাশংকর রায় লিখেছেন, “গান্ধী না থাকলেও ভারত এক দিন না এক দিন স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান কি আদৌ সম্ভব হতো?” এরপর তিনি বলেন, ভারতকে স্বাধীন করার দাবিদার আরও একজন-দুজনের নাম শোনা যায়, কিন্তু পাকিস্তানকে স্বতন্ত্র করার দাবিদার আর একজনও নেই। কথাগুলো জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সামনে আনে।

প্রথমেই একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য কী করেছিলেন, যার কারণে তিনি মুসলমানদের একজন বড় রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন?

ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানরা তখন রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি ছিল। সংখ্যায় অনেক হলেও শিক্ষায়, চাকরিতে ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তারা পিছিয়ে ছিল। এর মধ্যে মুসলমানদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অধিকার কী হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক কেমন হবে—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে থাকে। জিন্নাহ এই প্রশ্নগুলোকে রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসেন।

তিনি মুসলমানদের শুধু আবেগের জায়গা থেকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেননি; বরং তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের একটি বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান আন্দোলন আরও স্পষ্ট রূপ নেয় এবং জিন্নাহ এই আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে সামনে আসেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন একটি বড় সাফল্য লাভ করে।

তবে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন শুরু থেকেই এমন ছিল না। তিনি একসময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছেন। ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। একসময় তাঁকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ও বলা হতো। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবস্থানও বদলায়। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।

এই পরিবর্তনকে শুধু জিন্নাহর ব্যক্তিগত মতপরিবর্তন হিসেবে দেখলে বিষয়টি খুব সহজ করে ফেলা হয়। বরং সে সময়ের ভারতীয় রাজনীতি, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সম্পর্ক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুর রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে জিন্নাহকে পড়া দরকার।

জিন্নাহর রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাংবিধানিক পদ্ধতির ওপর তাঁর আস্থা। তিনি আইনজীবী ছিলেন এবং রাজনীতিতেও যুক্তি, আইন ও আলোচনাকে গুরুত্ব দিতেন। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান তিনি সবসময় সংঘাতের মাধ্যমে করতে চাইতেন না; বরং আলোচনা, সমঝোতা এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে রাজনীতি শুধু নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা নয়, অন্য পক্ষের দাবিকেও বোঝা এবং প্রয়োজন হলে সমঝোতার পথ খুঁজে নেওয়াও ছিল।

১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা তৈরি হয়েছিল এবং এতে জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকলেই যে একে অপরের সঙ্গে কথা বলা যাবে না, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই সময়টি তার বিপরীত একটি উদাহরণ।

পরে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান আরও কঠোর হলেও তিনি দীর্ঘ সময় সাংবিধানিক আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির পথেই এগিয়েছেন। তাঁর ১৪ দফায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এবং ফেডারেল কাঠামোর মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। অর্থাৎ তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যেখানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই শেষ কথা হবে না; বিভিন্ন গোষ্ঠীর অধিকার ও মতামতেরও জায়গা থাকবে।

আজকের রাজনীতির দিকে তাকালে জিন্নাহর এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। মতের পার্থক্য রাজনীতির স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই পার্থক্য যখন আলোচনার বদলে সংঘাত তৈরি করে, তখন রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিপক্ষকে হারানোই রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য নয়; কখনো কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে বসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোও রাজনৈতিক সাফল্য।

জিন্নাহর রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে দেওয়া তাঁর ভাষণে। সেখানে তিনি নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরাপত্তার কথা বলেন। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেন, যেখানে মানুষ নিজের ধর্ম পালনে স্বাধীন থাকবে এবং নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে।

এখানে জিন্নাহকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। একদিকে তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের জন্য আন্দোলন করেছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সমান অধিকারের কথাও বলেছেন। এই দুই দিককে পাশাপাশি রেখে জিন্নাহকে পড়লে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার জটিলতা আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

বর্তমান সময়েও এই চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। একটি রাষ্ট্রে মানুষ ভিন্ন ধর্মের হতে পারে, ভিন্ন মতের হতে পারে, ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিক অধিকার সমান হওয়া দরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সংখ্যালঘুর অধিকার উপেক্ষা করা যাবে। এই জায়গায় জিন্নাহর নাগরিক-সমতার ধারণা আমাদের নতুন করে ভাবতে পারে।

দুর্নীতি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধেও জিন্নাহর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্টের ভাষণে তিনি ঘুষ, দুর্নীতি ও কালোবাজারিকে রাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। স্বাধীনতার পাচ দশক পরও দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের সমাজের বড় সমস্যা। তাই জিন্নাহর সেই সতর্কবার্তাও আজ অপ্রাসঙ্গিক নয়।

জিন্নাহর নেতৃত্বের আরেকটি দিক ছিল তাঁর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতি করেছেন এবং নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। একজন আইনজীবী হিসেবে যুক্তি দিয়ে কথা বলা, নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা এবং রাজনৈতিক বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। বর্তমান তরুণদের জন্যও এই দিকটি শিক্ষণীয়।

তবে জিন্নাহকে পুনর্পাঠ মানে তাঁকে ভুলের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা নয়। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে। বিশেষ করে ভাষা ও দেশভাগের মতো বিষয় আমাদের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে শুধু একটি বক্তব্য বা একটি ঘটনার মধ্যে আটকে রাখলে তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনকে বোঝা সম্ভব নয়।

আমাদের ইতিহাসকে শুধু ভালোবাসা বা ঘৃণার চোখে না দেখে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। জিন্নাহকে পুনর্পাঠের প্রয়োজনও এখানেই। তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে আমরা সাংবিধানিক রাজনীতি, রাজনৈতিক আলোচনা, সমঝোতা, নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে অনেক কিছু ভাবতে পারি।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, আদর্শের পার্থক্যও থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্যের মধ্যেও কথা বলার জায়গা, আলোচনার জায়গা এবং সমাধানের চেষ্টা থাকা জরুরি। জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের এই শিক্ষাটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনেক কিছুই আমাদের অজানা থেকে যাবে। তাঁকে নতুন করে পড়ার অর্থ তাঁকে নতুন করে মহান বানানো নয়; বরং তাঁর রাজনীতি থেকে বর্তমানের জন্য কী শেখার আছে, তা খুঁজে বের করা।

ইতিহাসের পুনর্পাঠ তখনই অর্থবহ হয়, যখন অতীত আমাদের বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে। সেই অর্থে জিন্নাহ শুধু অতীতের একজন নেতা নন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি আস্থা, আলোচনা ও সমঝোতার রাজনীতি, মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক সমতা এবং সুশাসনের চিন্তা আজও আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। আর এ কারণেই কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নতুন করে পড়া জরুরি।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।