বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

প্রবাস জীবন: প্রকৃত সুখের সংজ্ঞা

Author

ফাহিম ফয়সাল , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৫ পাঠ: ৩০ বার

সুখ একটি সহজ শব্দ হলেও, এর ব্যাখ্যা যেন জটিল ও আপেক্ষিক। কেউ সুখ খোঁজে নিরাপদ জীবনে, কেউ খোঁজে অর্থে আবার কেউ ভালোবাসার মাঝে। কিন্তু সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা আসলে কী? কেবল অর্থ উপার্জনই কি সুখের পরিচায়ক? কথায় আছে, অর্থই অনর্থের মূল। অর্থই যদি সুখের নিয়ামক হতো, তবে এই পৃথিবীর ধনকুবেরেরা বিষণ্ণতায় ভুগতেন না। বিপুল অর্থ উপার্জন, মাথাভর্তি দুশ্চিন্তা ইত্যাদির মাঝে সুখ নেই। বরং বৈধভাবে উপার্জন করে পরিবার নিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়ার মাঝেও এক অপরিমেয় সুখ পাওয়া যায়।

প্রতি বছর এই দেশের অসংখ্য মানুষ সুখের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। লক্ষ্য একটাই ভালো থাকা, পরিবারকে ভালো রাখা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে কি এর শেষ পরিণতি সুখকর হয়, নাকি তা রূপ নেয় এক দুঃসহ যন্ত্রণায়? বাংলাদেশের এমন অনেক গ্রাম রয়েছে, যার প্রায় সকল পুরুষই প্রবাসী। ফলে অনেক এলাকার নামকরণ হয়ে গেছে ‘বিদেশি পাড়া’, ‘প্রবাসী পাড়া’ ইত্যাদি।

এই দেশের অনেক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমানোর সময় প্রতারণার শিকার হন। বিভিন্ন আদম ব্যাপারী ও প্রতারক এজেন্সি তাদের কাছে উন্নত মানের ভিসা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চড়া মূল্য দাবি করে। দেশের সরলমনা সাধারণ মানুষ চটকদার বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে জায়গা-জমি বন্ধক রেখে তাদের টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু বিমানের টিকিট হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় বিপত্তি। দেখা যায়, তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের ভিসা। কিন্তু প্রমাণ এবং আইনি জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকেই এর প্রতিবাদ করার সাহস পান না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়ে, সেই ভিসা নিয়েই তাদের বিদেশ বিভূঁইয়ে পাড়ি জমাতে হয়।

প্রবাস জীবনের শুরুতেই একজন বাংলাদেশি ধাক্কা খায় সেই দেশের নতুন শহর চিনতে, ভাষা শিখতে এবং নতুন নিয়ম-কানুন জানতে গিয়ে। শুরুতে এক ধরনের রোমাঞ্চ কাজ করে; মনে হয়, এই বুঝি নতুন জীবনের শুরু! কিন্তু সময় যত এগোয়, ততই বোঝা যায় এই নতুনতা আসলে কতটা একাকী করে দেয়। কাজের চাপ, ভাষাগত সমস্যা, সংস্কৃতির পার্থক্য সব মিলিয়ে একজন প্রবাসীকে নীরবে সহ্য করতে হয় অনেক কিছু।

এই দেশের অধিকাংশ মানুষ এরূপ ধারণা লালন করে যে, প্রবাসজীবন মানেই মোটা অঙ্কের টাকা। অথচ দেশে একই কাজ করে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা যায়, তার সমপরিমাণ কিংবা তার চেয়ে সামান্য বেশি আয়ের সুযোগ থাকে বিদেশে। তবে এই আয়ের পেছনে থাকে এক হাড়ভাঙা পরিশ্রম। সেখানে প্রতিদিনই কেবল কাজ, কাজ আর কাজ। বাড়তি আয়ের জন্য অনেকে একাধিক কাজ করেন, যদিও অনেকেরই আবার একাধিক কাজের অনুমোদন থাকে না। দিনশেষে উপার্জনের অধিকাংশই চলে যায় পরিবারের পেছনে। নিজের জন্য কিছু রাখা, নিজের ভালো লাগা কিংবা স্বপ্নপূরণ—সবই যেন একপ্রকার বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। জীবন এমন এক দোলাচলে পড়ে যায়, যেখানে কেবল দিয়েই যেতে হয়; আর পেতে হলে অপেক্ষা করতে হয় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য।

প্রবাসের প্রতিটি দিনই যেন একেকটি মানসিক পরীক্ষা। মুক্ত পৃথিবীতে অবস্থান করেও, প্রবাসীদের প্রতিটি দিন যেন জেলখানায় কাটানোর মতো। প্রবাসীদের জীবনে উৎসব আসে, ঈদ আসে, নতুন বছর আসে  সবই আসে নিঃশব্দে। নেই কোনো সাড়া, নেই কোলাহল শুধুই স্মৃতিরা হানা দেয়। অনেকেই ফোনে হাসিমাখা মুখ দেখিয়ে পরিবারকে বোঝান যে তারা ভালো আছেন। কিন্তু ভেতরে চেপে রাখেন এক চাপা কান্নার বুকফাটা আর্তনাদ।

কথায় আছে ‘চোখের আড়াল মানে মনের আড়াল’। একজন প্রবাসী বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করেন। পরিবারের সাথে সরাসরি দেখা করার সুযোগ অনেক সময়ই পান না। শুধুমাত্র ফোনে ভিডিও কিংবা অডিও কলে যতটুকু কথা হয়, তাতেই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু এই দূরত্বই তার জীবনে এক মহাবিপদ ডেকে আনে, যার প্রভাব পড়ে তার সাংসারিক ও পারিবারিক জীবনের ওপর। দীর্ঘদিনের এ দূরত্বের ফলে অনেক প্রবাসীর স্ত্রীর মনে তার প্রতি ভালোবাসার টান কমে যায়। পরবর্তীতে সংসার ছেড়ে যাওয়া কিংবা পরকীয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতেও দেখা যায়। সন্তানদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেকে বিপথে চলে যায়। পিতার প্রতি তাদের মমত্ববোধ কাজ করে না। বরং পিতা তাদের কাছে কেবল টাকার মেশিনের মতো একটি বস্তু হয়ে ওঠেন। অর্থের মোহে পড়ে অনেক সময় বাবা-মাও ভুলে যান তাদের দায়িত্ববোধ। তখন আর ভালোবাসা কাজ করে না, কেবল অর্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

তবে প্রবাস জীবন অনেকের জীবন পাল্টে দিতেও ভূমিকা রাখে। প্রবাস মানুষকে দায়িত্ব নিতে শেখায়, সময়ানুবর্তিতা শেখায়, নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়তে সাহস জোগায়। অনেকেই প্রবাস থেকে ফিরে স্বাবলম্বী হন এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেন। তবে এর সবকিছুর পেছনেই থাকে এক বিশাল আত্মত্যাগ। প্রবাসীরা এ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের প্রেরিত রেমিটেন্স থেকেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। তবে অর্থনীতি সচল করতে গিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারের চাকা যদি স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং সবদিক বিবেচনায় রেখে, পরিবার পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে তারপর বিদেশে পাড়ি জমানো উচিত। এতে দেশের যেমন মঙ্গল, তেমনি নিজেরও কল্যাণ নিহিত থাকে। তাই প্রত্যেক ইচ্ছুক প্রবাসীর উচিত এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ জুন ২০২৫ তারিখে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!