শিক্ষকের মর্যাদা

ইসলামে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জ্ঞান অর্জন যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি জ্ঞান অন্বেষণে শিক্ষকের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাঝিবিহীন নৌকা যেমন পারের দিশা পায় না, তেমনি শিক্ষকবিহীন ছাত্রও সঠিক জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শিক্ষকের সঙ্গে সর্বদা উত্তম আচরণ করা উচিত।
কোরআনের নাজিলকৃত প্রথম সুরায় বলা হয়েছে, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো, তোমার প্রভু মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানতো না।’ (সুরা আলাক ১-৫) মহান আল্লাহ ওই আয়াতগুলোর মাধ্যমে শিক্ষকতার মতো মহান এ পেশাকে মহিমান্বিত করেছেন।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। এ পৃথিবীতে শিক্ষকতা এক উত্তম পেশার নাম। শিক্ষকরা তাদের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের কাছে তার আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদের পবিত্র করেন। তাদের কিতাব (কোরআন) ও প্রজ্ঞা (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন।’ (সুরা জুমুআ ০২) অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হজরত রাসুল (সা.)-কে পৃথিবীতে শিক্ষকের ভূমিকায় প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। রাসুল (সা.) নিজের শিক্ষকতার বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ (ইবনে মাজাহ ২২৯)
মহান আল্লাহ নিজে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন বলে পবিত্র কোরআন থেকে জানা যায়। মানবজাতির প্রথম মানুষ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর তার শিক্ষকরূপে তিনি আদমকে বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের সব জ্ঞান শিখিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় রাখার মাধ্যমে শিক্ষাগুরুর মর্যাদাকে অতিউচ্চ পর্যায়ে স্থান দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘তিনি আদমকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন এবং বললেন এ বস্তুগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সুরা বাকারা ৩১) এ ছাড়া কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই শিখিয়েছেন মনের কথা প্রকাশ করতে।’ (সুরা আর রাহমান ৩-৪)
শিক্ষক সবার শ্রদ্ধার পাত্র। তবে শিক্ষককে হতে হবে আদর্শবান। তিনি যেরূপ ছাত্রদের শাসন করবেন অনুরূপ তাদের স্নেহও করবেন। কথায় আছে, শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে। শুধু শাসনের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ছাত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা কোনো আদর্শ শিক্ষকের কাজ হতে পারে না। শিক্ষকের মর্যাদার এক উজ্জ্বল নমুনা দেখিয়েছেন মুঘল সম্রাট আলমগীর। তার ছেলেকে এক শিক্ষক পড়াতেন। একদিন সম্রাট আলমগীর দেখলেন, তার ছেলে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছে। কিন্তু শিক্ষকের পা কেন নিজ হাতে পরিষ্কার করে দেয়নি, সেজন্য তিনি ব্যথিত হন। এজন্য তিনি শিক্ষকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। শিক্ষকের প্রতি তার এ সম্মান ছিল অকৃত্রিম, যা সত্যিই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এক অনন্য উপমা।

