বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কাঁপবে পুরো বিশ্ব

Author

ফাহিম ফয়সাল , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৫ পাঠ: ৩৫ বার

বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে কিছু অঞ্চল কৌশলগত দিক থেকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেগুলোতে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনই এক অঞ্চল হলো হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, বিশেষ করে জ্বালানির জন্য।

হরমুজ প্রণালী একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা পশ্চিমে পারস্য উপসাগরকে পূর্বে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করেছে। এর প্রস্থ সর্বনিম্ন ৩৯ কিলোমিটার, তবে কার্যকর নৌ-চলাচলের পথ মাত্র ১০ কিলোমিটারের মতো।

বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল এই প্রণালী দিয়েই পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো যেমন: সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান- সবাই তাদের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পাঠায়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের বেশির ভাগই এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক মারাত্মক বিমান হামলায় ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ গ্রহণ করে- হরমুজ প্রণালী বন্ধের পক্ষে ভোট দেয়। যদিও এই সিদ্ধান্ত এখনও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, তবু এটি বৈশ্বিকভাবে এক ভয়াবহ বার্তা দিয়েছে।

ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা প্রতিহত করতে গেলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ জরুরি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে সেই বার্তাই দিতে চায় তারা।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে যাবে। ইতিহাস বলছে, ২০১১ সালে ইরান যখন হুমকি দিয়েছিল এই প্রণালী বন্ধ করার, তখনই তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার ( তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৮,০০০ টাকায়) উঠে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে প্রণালী বন্ধ হলে বর্তমানে তা ২০০ ডলার অর্থাৎ প্রায় ২৪,৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মারাত্মক ধাক্কা হয়ে উঠবে।

জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও কৃষি সবখানেই খরচ বেড়ে যাবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম বাড়বে, দেখা দেবে মুদ্রাস্ফীতি। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলো (যেমন: বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, লেবানন ইত্যাদি) ভয়াবহ চাপের মুখে পড়বে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত মূলত আসবে ইরানের পক্ষ থেকে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো কৌশলগতভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বাধতে পারে, যা গোটা বিশ্বেই নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নিয়মিত টহল দেয়। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে, আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রণালীটি খোলা রাখার চেষ্টা করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও সংকটে পড়বে, কারণ তাদের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই আসে। এরূপ রেষারেষি ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে, একপর্যায়ে তা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশ একটি জ্বালানি-নির্ভর দেশ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ডলার সংকট আরও প্রকট হবে, ব্যাংক ঋণ ও সুদের হার বেড়ে যেতে পারে, চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠবে। সরকারকে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে, যা বাজেট ঘাটতির সৃষ্টি করবে।

হরমুজ প্রণালী কেবল একটি সংকীর্ণ জলপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা পৃথিবী তার কম্পন অনুভব করবে। জ্বালানিনির্ভর এই দুনিয়ায় একটি সংকট আমাদের কতটা অনিরাপদ করে তুলতে পারে, তা হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে।

তাই সময় থাকতেই জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প পথ নির্মাণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে-না হলে একটি জলপথ বন্ধ হয়ে গোটা পৃথিবী বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৪ জুন ২০২৫ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!