বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরবি ভাষার গুরুত্ব

Author

ফাহিম ফয়সাল , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৪ পাঠ: ৫০ বার

ইংরেজী

ও ফরাসি ভাষার পরে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক বিস্তৃত ভাষা হলো আরবি। জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষার মধ্যে আরবি অন্যতম। বর্তমানে আধুনিক প্রমিত আরবি ২৮টি রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা এবং বিশ্বে আরবি ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লক্ষ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মানুষের মাতৃভাষা আরবি। আর সেই দেশগুলো সকলের নিকট আরব নামে পরিচিত। আরবের রয়েছে এক সমৃদ্ধ অর্থনীতি। তাদের অর্থনীতি মূলত তেল ও বিভিন্ন খনিজ সম্পদ যেমন স্বর্ণ, রৌপ্য, আয়রন, তামা, দস্তা ইত্যাদি উপর নির্ভর করে।

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আরব দেশগুলোয় পাড়ি জমায় কাজের উদ্দেশ্যে। সৌদি আরবসহ কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও বাহরাইনে প্রচুর পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশী কাজ করে। গণমাধ্যমের এক তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে সর্বাধিক রেমিট্যান্স এসেছে আরব-আমিরাতের প্রবাসী বাংলাদেশীদের থেকে। যা সংখ্যায় হিসাব করলে দাঁড়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়াও সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, কাতার থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছে যথাক্রমে ৫১ কোটি ৩৩ লাখ, ২৪ কোটি ৫১ লাখ, ২১ কোটি ৪৭ লাখ, ১৭ কোটি ৬৩ লাখ মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশের ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আরব দেশগুলোতে মূলত সরকারী ও বেসরকারী সকল কাজ আরবি ভাষায় হয়ে থাকে। সেজন্য যখন কেউ আরবে পড়ালেখা, কাজ কিংবা অন্য কোন কারণে যেতে চায় তখন তার কাগজপত্রগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করে নিতে হয়। বাংলাদেশ থেকে যখন কেউ আরবে কাজের স্বার্থে যেতে চায় তখন বাংলাদেশ সরকার কিংবা এজেন্সি কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে তাকে আরবি ভাষা শেখানো হয়। এরপর সে হয়তো ভাঙ্গা ভাঙ্গা আরবি বলতে পারে কিন্তু আরবি পড়তে বা লিখতে পারে না। এরূপ ভাসাভাসা আরবি নিয়ে আরব দেশগুলোয় প্রবাসী বাংলাদেশীরা খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। যার ফলে সে দেশের কর্মস্থানে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরী হয় এবং তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো সৌদি আরবে প্রবাসীদের সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ ভারত। আরব দেশের বিভিন্ন তৈলশোধনাগারের কাজে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ সৌদি আরবের ধর্মীয় ও সংস্কৃতির সাথে ভারতের বিস্তর ফারাক। ভারতের বিভিন্ন মাদ্রাসাগুলোয় আরবি ভাষা শেখার আলাদা সুযোগ রয়েছে। সেখানে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও গিয়ে নিয়মিত আরবি শিখে এবং এ ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে। এছাড়াও ভারতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষার উপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে। যার ফলে ভারতীয়রা খুব সহজেই এ ভাষা রপ্ত করে আরব দেশগুলোয় পাড়ি জমাচ্ছে এবং দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করছে। দেশীয় একটি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সমগ্র বিশ্বে শীর্ষ রেমিট্যান্স আয়কারী দেশ ছিল ভারত। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১১১ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর তাদের এই রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। যেমন ২০১০ সালে তাদের আয়কৃত রেমিট্যান্স এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৩.৪৮ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮৩.১৫ বিলিয়ন ডলারে এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে এর পরিমাণ ১১১.২২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে যে তিনটি খাত সেগুলো হলো, কৃষি, গার্মেন্টস এবং রেমিট্যান্স। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। প্রায় ২৮ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যদি প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে তাদের কমিউনিকেশন গ্যাপ দূর করা যায় তাহলে কর্মক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সুযোগের পরিমাণ বাড়বে। এতে করে প্রতিবছর আমাদের আকাঙ্ক্ষার চেয়েও অধিক রেমিট্যান্স আমরা অর্জন করতে পারবো।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশে আরবি শেখার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। সরকারিভাবে কিংবা এজেন্সি থেকে যেভাবে আরবি শেখানো হয় এতে করে পরিপূর্ণ চাহিদা পূরণ হয় না। কেননা, সেখানে শুধুমাত্র আরবি ভাষায় কথা বলার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আরবি ভাষা পড়তে পারা কিংবা লিখতে পারার বিষয়টা একদম উপেক্ষা করা হয়। আরবি একটি আন্তর্জাতিক ভাষার পাশাপাশি এটি মুসলিমদের ধর্মীয় ভাষা। এই ভাষাতেই মুসলিমদের কুরআন, হাদিস ও বিভিন্ন বইপত্র লিখিত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিটি শ্রেণিতে এই ভাষার অধ্যয়ন ও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিৎ। এতে করে একজন মানুষ প্রাথমিক থেকে ধীরে ধীরে আরবি শিখবে এবং একটি পর্যায়ে তার ভাষাগত দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি প্রতিটি শ্রেণিতে এই ভাষার অধ্যয়ন চালু করা হলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে বেকারত্বও আংশিক হারে কমে আসবে। অতঃপর কেউ যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কর্মের তাগিদে পাড়ি জমাতে চায় তখন তার ভাষাগত দক্ষতার জন্য সেই দেশগুলোয় সে অন্যসব দেশের প্রবাসীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারবে। তার আয়ের পরিমাণ যেমন বৃদ্ধি পাবে পাশাপাশি রেমিট্যান্সও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সমগ্র বিশ্বে তার তিন শূন্য তত্ত্বের জন্য আলোচিত। সেগুলো হলো, দারিদ্র, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা। যদি এ দেশে আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে শেখা এবং শেখানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তবে তা যেমন দেশীয় অর্থনীতির উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে বেকারত্ব এবং দারিদ্র কমবে।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!