বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

র‌্যাগিং রোধে চাই কঠোর শাস্তি

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ পাঠ: ৪৫ বার

এই তোর নাম কি? রোজিনা (ছদ্মনাম)। পুরো নাম বলতে পারিসনা? বেয়াদব কোথাকার! ক্যাম্পাসে আশা দুদিন হয়নি তাতেই পাখনা গজিয়ে গেছে? বয়ফ্রেন্ড আছে? মেয়েটি নতজানু হয়ে নিচ দিকে তাকিয়ে বলে না ভাইয়া। বেয়াদব, বড়দের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানিস না? নিচের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? তুই এখন আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে প্রপোজ করবি। যদি না পারিস তোর খবর আছে!
বিভাগের সিনিয়রেরা নবাগত শিক্ষার্থীদের সাথে কথিত পরিচয়ের নামে এইরকম জঘন্য আচরণ করে থাকে যা র‌্যাগিং নামে পরিচিত। সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ক্লাসরুম থেকে শিক্ষককে বের করে দিয়ে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের কর্তৃক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাসরুমে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অল্প কয়েকদিন আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে র‌্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা দেবার পরেও ক্লাসরুমে নবাগত শিক্ষার্থীদেরকে লাঞ্চনার ফেসবুকে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় চলছে।
ইংরেজি জধম শব্দটির আভিধানিক অর্থ জ্বালাতন করা, রসিকতার নামে কাউকে অত্যাচার করা হোক সেটি মানসিক কিংবা শারীরিক। অনেক শিক্ষার্থী এটি সহ্য না করতে পেরে আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার নজিরও রয়েছে আমাদের দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞানচর্চার উন্মুক্ত গবেষণাগার। কিন্তু এই গবেষণাগারে ঢুকেই যদি মানুষরূপী কীটপতঙ্গের নির্যাতনের শিকার হয় তবে কোমলতি দেশের ভবিষ্যতের সম্পদগুলো কিভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে?
র‌্যাগিংকে অনেকে মজা, আদব-কায়দা শেখানো, সিনিয়র-জুনিয়র গভীর সম্পর্ক উন্নয়ন, বাস্তব পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে শক্ত করে গড়ে তোলা ইত্যাদি নামে প্রচার করে থাকে। কিন্তু এটি কোনো সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম হতে পারেনা তা মানসিক এই বিকারগ্রস্থ ব্যক্তিদের কে বোঝাবে? র‌্যাগিং শুধুমাত্র বিকারগ্রস্থ বিকৃত, অমানবিক নির্যাতনের নাম নয় বরং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, র‌্যাগিং নিয়ে এতো লেখালেখি আর সংবাদ প্রচারের পরেও আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত র‌্যাগিং প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান নেই।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‌্যাগিংয়ের নীরব নিপীড়ন চলে। কিন্তু ভয়ে অনেক সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা স্বীকার করতেও ভয় পায়। কারণ মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদেরকে শাসিয়ে দেওয়া হয়, যদি এই ঘটনা কারো সামনে প্রকাশ করা হয় তবে এর চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে এটিকে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি হিসেবেই মেনে নিয়ে থাকে। আবার এটি বন্ধে ছাত্র রাজনীতির নোংরা দাপটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারেনা। আবার ব্যবস্থা নেবার উদ্যোগ স্বরূপ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেই তদন্ত কমিটির অদৃশ্য শক্তির বলয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেনা।
উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যায় এবং পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথমেই যে আতঙ্ক বিরাজ করে তা হল কথিত সম্পর্ক উন্নয়নের নামে র‌্যাগিং প্রথা। কোমলতি শিক্ষার্থীদের মনেও সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করে এই জঘন্য ভয়ংকর নোংরামিটির। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং প্রথাটি নিষিদ্ধ হলেও এই অপরাধকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে কোনোভাবেই এটি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। র‌্যাগিং নিয়ে এতো গণমাধ্যমে এতো সংবাদ প্রচারের আর লেখালেখি পড়তে পড়তে অনেকের কাছে হয়ত ডাল-ভাতের মত হয়ে গেছে বিষয়টি। সবচেয়ে অবাক লাগে তখনই, যখন র‌্যাগ দেওয়া কথিত বড় ভাইটি তার কু-কর্মের কথা আনন্দচিত্তে বর্ণনা করতে থাকে। ভাবতে ঘৃণা হয় এরা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী।
সময় এসেছ ঘুরে দাঁড়াবার। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভর্তিযুদ্ধে বিজয়ী মেধাবীদের স্বপ্ন পূরণে যেন কেউ বাঁধার কারণ না হয়ে দাঁড়াতে পারে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত অপরাধীকে কেবলমাত্র অপরাধের দৃষ্টিতে দেখে রাজনৈতিক শক্তির কাছে নত না হয়ে কৃতকর্মের শাস্তি নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র র‌্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা আর প্রচারের মাধ্যমেই র‌্যাগ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদ।
এই লেখাটি ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!