বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইরান কেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ?

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৭ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৩২ বার

ইরান কেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ?

চলতি দশকের ইরানকে একটি সাধারণ রাষ্ট্র মনে করলে ভুল হবে; ইরান এক দীর্ঘ ইতিহাসের ধারক, এক জটিল সভ্যতার উত্তরাধিকারী এবং একইসাথে সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির এক কেন্দ্রীয় শক্তি। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কয়েকটি দেশ নিজেদের উপস্থিতি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যাদের উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব, ইরান তাদের মধ্যে অন্যতম। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেও ইরানের বড় ভূমিকা রয়েছে। তার গুরুত্বের শিকড় বহুস্তরীয়; ভূগোল, ইতিহাস, ধর্ম, জ্বালানি সম্পদ, সামরিক কৌশল এবং আদর্শিক অবস্থান; সবকিছুর সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই গুরুত্বের ভিত।

 

 ইরান বিশ্ব মানচিত্রের এমন এক স্থানে অবস্থিত যেখানে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। তার দক্ষিণে পারস্য উপসাগর, যা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। পারস্য উপসাগর ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে পৃথক করেছে। এই উপসাগরের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য রক্তস্রোতের মতো। এই পথের নিরাপত্তা বা অস্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর, আর সেই নিয়ন্ত্রণে ইরানের ভূমিকাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যায় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী, যা ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যেখানে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল চলাচল করে। এই প্রণালীর ওপর ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এক ধরনের কৌশলগত ক্ষমতা দেয়, যা প্রয়োজনে সে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।

 

 তবে শুধু ভূগোল নয়, ইরানের ইতিহাসও তাকে বিশ্বরাজনীতিতে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। পারস্য সাম্রাজ্য ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী সাম্রাজ্য। এই ঐতিহ্য ইরানিদের মধ্যে এক ধরনের জাতিগত গর্ব ও আত্মপরিচয় তৈরি করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক মনোভাবেও প্রতিফলিত হয়। আধুনিক যুগে এসে এই ঐতিহাসিক চেতনা নতুন রূপ পেয়েছে, বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবের পর। এই বিপ্লব শুধু একটি সরকারের পতন নয়; এটি ছিল এক আদর্শিক পরিবর্তন, যেখানে পশ্চিমা প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিপ্লবের পর থেকেই ইরান নিজেকে একটি আলাদা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, যে শক্তি পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত।

 

 এই আদর্শিক অবস্থানই ইরানকে অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে। বিশ্বরাজনীতিতে অধিকাংশ রাষ্ট্রই কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। কিন্তু ইরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় দাঁড়িয়ে থেকেছে। এই দ্বন্দ্ব শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি আদর্শিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সব দিকেই বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, চাপ, এমনকি সামরিক হামলা; সবকিছুর মধ্যেও ইরান নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে এক ধরনের প্রতীকী শক্তিতে পরিণত করেছে, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধী।

 

 মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের ভূমিকা আরও গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। সৌদি আরবের সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি মূলত একটি ধর্মীয় বিভাজনের প্রতিফলন, শিয়া ও সুন্নি দ্বন্দ্ব। ইরান শিয়া মুসলিমদের নেতৃত্ব দেয়, আর সৌদি আরব সুন্নি বিশ্বের প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই দ্বন্দ্ব ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ইরান এই দেশগুলোতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছে, যা তাকে একটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে অনেকটা বৈশ্বিক খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

 

 বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও হামাস এর মতো সংগঠনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক তাকে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে। ইসরায়েল ইরানকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে, আর ইরানও ইসরায়েলের নীতির তীব্র বিরোধিতা করে। এই সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং বিশ্বরাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

 

 ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার জ্বালানি সম্পদ। বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে এই দেশের। ওপেক এর সদস্য হিসেবে ইরান তেলের উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তার উৎপাদন ও রপ্তানি অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে, তবুও তার সম্ভাবনা এবং বাস্তব ক্ষমতা তাকে জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্রে রাখে। বিশ্ব অর্থনীতি যখনই অস্থিতিশীল হয়, তখন ইরানের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসে।

 

 নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বিশেষ করে তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। JCPOA বা পারমাণবিক চুক্তি ছিল এই উত্তেজনা কমানোর একটি বড় উদ্যোগ। যদিও এই চুক্তি একসময় কার্যকর হয়েছিল, পরে তা ভেঙে যায় এবং পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বিশ্বরাজনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ এটি শুধু একটি আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

 

 এই পারমাণবিক ইস্যু ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে যেখানে সে একইসাথে হুমকি ও প্রয়োজন দুটোই। একদিকে তার সম্ভাব্য পারমাণবিক শক্তি বিশ্বশান্তির জন্য উদ্বেগের কারণ, অন্যদিকে তাকে বাদ দিয়ে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। ফলে বিশ্বশক্তিগুলোকে বারবার ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হয়, যা তার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

 ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোও তাকে আলাদা করে তোলে। এটি একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং নির্বাচিত সরকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য রয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির মতো ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, যা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই ভিন্ন। এই কাঠামো ইরানকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যা অনেক সময় বিতর্কিত হলেও তার নিজস্ব শক্তি হিসেবে কাজ করে।

 

 বিশ্বের অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা একটি নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্য তৈরি করছে। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে একটি বিকল্প শক্তি কাঠামো গড়ে উঠছে, যেখানে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামরিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। সবকিছু মিলিয়ে ইরানকে একটি বহুমাত্রিক শক্তি হিসেবে দেখা যায়। তার গুরুত্ব কোনো একক কারণে নয়; বরং বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলনে গড়ে উঠেছে। ভূগোল তাকে দিয়েছে কৌশলগত অবস্থান, ইতিহাস দিয়েছে পরিচয়, আদর্শ দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য, আর সম্পদ দিয়েছে বাস্তব ক্ষমতা। এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ইরান আজ বিশ্বরাজনীতির এক অপরিহার্য অংশ।

 

 সব জটিলতা, সব বহুমাত্রিকতা মিলিয়ে ইরান এক রহস্যময় শক্তি, যার প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আর এই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছকে ইরান শুধু একটি ঘুঁটি নয়; অনেক সময় সে নিজেই খেলার নিয়ম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!