বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উপকূলে নতুন অর্থনীতি: সম্ভাবনা, সংকট ও আমাদের প্রস্তুতি

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৫ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৩১ বার

বাংলাদেশের উপকূল আর শুধু দুর্যোগের ভূগোল নয়, এটি এখন এক উদীয়মান অর্থনীতির মানচিত্র। ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে যে আলোচনা আজ জোরালো, তার পেছনে রয়েছে বাস্তব পরিসংখ্যান, বৈশ্বিক প্রবণতা এবং স্থানীয় জীবিকার গভীর পরিবর্তন। কিন্তু এই অর্থনীতি যেমন সম্ভাবনার, তেমনি বৈষম্য ও ঝুঁকিরও। একসময় দক্ষিণ উপকূল ছিল ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এখন সেই উপকূলই নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে; যেখানে প্রকৃতি, প্রযুক্তি আর মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা মিলিয়ে গড়ে উঠছে এক ভিন্নধর্মী অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

 

বাংলাদেশ এখন প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিশাল সমুদ্রসীমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা অর্থনৈতিক ব্যবহারের জন্য এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে । সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি ইতিমধ্যে দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র বা নীল অর্থনীতির অবদান প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাংলাদেশী মাছ শিকার এবং ৬০ লাখ বাংলাদেশী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরি ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে জড়িত। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, উপকূল আর প্রান্ত নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় কেন্দ্র।

 

প্রথমত, মৎস্য ও জলজ সম্পদ খাতের রূপান্তর লক্ষণীয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো মৎস্য ও জলজ সম্পদ। এই খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল । আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, দেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৬০% আসে মাছ থেকে।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ৩১৬.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে। এর মানে, উপকূলীয় একেকটি ঘের শুধু স্থানীয় জীবিকা নয়, বৈদেশিক মুদ্রারও উৎস। তবে এই সাফল্যের আড়ালে আছে অতিরিক্ত আহরণ, প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা এবং ক্ষুদ্র জেলেদের অনিশ্চয়তা, যা টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা। প্রচলিত জেলেজীবনের পাশাপাশি এখন কাঁকড়া চাষ, সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, এমনকি রপ্তানিমুখী সামুদ্রিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। অনেক উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। ফলে অর্থনীতি আর শুধু কৃষিনির্ভর নেই; বরং বহুমুখীকরণের পথে হাঁটছে।

 

দ্বিতীয়ত, পর্যটন শিল্পের নতুন গতি। কক্সবাজার, কুয়াকাটা বা সুন্দরবনের মতো অঞ্চলগুলো এখন শুধু ভ্রমণের স্থান নয়, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র। হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, গাইডিং- সব মিলিয়ে একটি সাপ্লাই চেইন তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের আয়ের উৎস বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় পর্যটন মোট জিডিপির প্রায় ৫% এবং কর্মসংস্থানের ৬–৭% তৈরি করে। বাংলাদেশে এই খাত এখনো পূর্ণ বিকশিত হয়নি, কিন্তু সম্ভাবনা বিশাল।

 

সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে বছরে প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা বা ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষা মতে, শুধুমাত্র পর্যটনই নয়, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৫,৮৫৬ কোটি টাকা বা ৫৮.৫ বিলিয়ন ডলার অবদান আসে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তবুও বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং পরিবেশের ক্ষয় এই সম্ভাবনাকে সীমিত করে রাখছে।

 

তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত উপকূলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ বাড়ছে। উপকূলীয় খোলা জায়গা ও বাতাসের প্রবাহ এই খাতকে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। এটি শুধু জ্বালানি সংকট কমাবে না, বরং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির ভিত্তিও গড়ে তুলবে।

 

তবে এই নতুন অর্থনীতির পথে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এই অঞ্চলে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা- সবই মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় টেকসই হয় না। এছাড়া সামাজিক বৈষম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন অর্থনীতির সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। কিছু মানুষ দ্রুত উন্নত হচ্ছে, আবার অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।

 

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মানুষ বাস করে । কিন্তু নতুন অর্থনীতির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বড় বিনিয়োগ ও করপোরেট খাত যেখানে লাভবান হচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্র জেলে, কৃষক বা দিনমজুররা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছে। এই বৈষম্যের ফলে একটি দ্বৈত অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে, একদিকে আধুনিক রপ্তানিমুখী খাত, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকা নির্ভর মানুষ। ফলে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রস্তুতি। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষা; এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যদি পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তাহলে এই নতুন অর্থনীতি হবে আরও শক্তিশালী ও টেকসই। সমুদ্র উপকূল আর শুধু প্রান্তিকতার প্রতীক নয়; এটি এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের দরকার দূরদর্শী পরিকল্পনা, সঠিক নীতি এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তবেই উপকূলীয় বাংলাদেশ হয়ে উঠবে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!