বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যৎ

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৬ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৯ বার

‘ছাত্র রাজনীতি’, এই শব্দবন্ধটি আমাদের সমাজে একদিকে যেমন সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস বহন করে, অন্যদিকে তেমনই বিতর্ক, ভীতি ও হতাশারও প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেও একটি মৌলিক প্রশ্ন কখনো মুছে যায় না, একটি জাতির গঠনে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা কতটা এবং এর ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল বর্তমান নয়, অতীত, প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করতে হয়।

 

মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, প্রশ্নমুখর এবং সম্ভাবনাময় সময় হলো তার ছাত্রজীবন। এই সময়েই একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে শুরু করে, সমাজকে নতুন করে দেখতে শেখে এবং প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করে। এই প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মূলত রাজনীতির জন্ম দেয়, কারণ রাজনীতি মানেই ক্ষমতার কাঠামো, ন্যায্যতার প্রশ্ন এবং সমাজ বিনির্মাণের প্রক্রিয়া। ফলে ছাত্রজীবন এবং রাজনীতি একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বরং বলা যায়, ছাত্র রাজনীতি হচ্ছে সেই ক্ষেত্র, যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয়।

 

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছাত্রসমাজের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ফ্রান্সের বিপ্লব থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন, কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, নেপালের জেন-জি বিপ্লব; সব ক্ষেত্রেই ছাত্ররা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কারণ, তরুণদের মধ্যে থাকে এক ধরনের নির্ভীকতা; তারা প্রতিষ্ঠিত অন্যায়কে মেনে নিতে চায় না এবং পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত থাকে। এই বৈশিষ্ট্যই ছাত্র রাজনীতিকে করে তোলে এক শক্তিশালী সামাজিক শক্তি।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও গভীর। ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্ররা শুধু ভাষার জন্য আন্দোলন করেনি, তারা একটি জাতির সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য ছাত্র অস্ত্র হাতে নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, ৯০-এ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ছাত্ররা জীবন দিয়েছে, ২৪-এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের নেতৃত্বে হাজারো জীবনের বিনিময়ে স্বৈরাচারের শাসন থেকে জাতি রক্ষা পেয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

তবে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা শুধু ঐতিহাসিক অবদানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। একজন ছাত্র যখন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সে বাস্তব জীবনের জটিলতা বুঝতে শেখে। সে শিখে কিভাবে একটি ইস্যু বিশ্লেষণ করতে হয়, কিভাবে মতামত গঠন করতে হয় এবং কিভাবে তা যুক্তিসঙ্গতভাবে উপস্থাপন করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় তার নেতৃত্বগুণ বিকশিত হয়, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ে এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি হয়। এগুলো এমন দক্ষতা, যা কেবল পাঠ্যপুস্তক থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়।

 

এছাড়া ছাত্র রাজনীতি একটি গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ক্যাম্পাস ছোট আকারে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। এখানে নির্বাচন, মতবিনিময়, বিতর্ক; সবকিছুই একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক কাঠামোর অনুশীলন হিসেবে কাজ করে। যদি এই চর্চা সুস্থভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও দক্ষ ও সচেতন ভূমিকা রাখতে পারে।

 

কিন্তু বাস্তবতার নির্মম দিক হলো, বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি তার এই আদর্শিক অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতার লড়াইয়ের ময়দানে, যেখানে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নয়, বরং বাহ্যিক রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থই প্রধান হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসে সহিংসতা, মারামারি, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি; এসব কর্মকাণ্ড ছাত্র রাজনীতির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি ছাত্র রাজনীতির অস্তিত্বে নয়, বরং এর বিকৃত প্রয়োগে। যখন রাজনীতি আদর্শ হারায় এবং কেবল ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি তার ইতিবাচক ভূমিকা হারিয়ে ফেলে। তাই সমাধান হলো ছাত্র রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং এটিকে পুনর্গঠন করা।

 

ছাত্র রাজনীতির সংস্কারের জন্য কয়েকটি মৌলিক দিক বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এর জন্য প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিজেদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে। তৃতীয়ত, দলীয় প্রভাব কমিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা; যেমন: শিক্ষা ব্যবস্থা, আবাসন, পরিবহন, কর্মসংস্থান- এসব ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

একইসঙ্গে আমাদের বুঝতে হবে যে, বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাত্র রাজনীতির নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এখন একটি আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আবার একইভাবে বিভ্রান্তিও ছড়াতে পারে। তাই নতুন প্রজন্মকে তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ডিজিটাল স্পেসে ছাত্র রাজনীতি যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি এটি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য। প্রায়শই একটি অভিযোগ শোনা যায়, রাজনীতিতে জড়ালে পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধারণাটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, কারণ বাস্তবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা রাজনীতির কারণে তাদের একাডেমিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে রাজনীতি এবং শিক্ষা একে অপরের পরিপন্থী। বরং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে রাজনীতি শিক্ষারই একটি সম্প্রসারিত রূপ হতে পারে, যেখানে তত্ত্ব ও বাস্তবতার মিলন ঘটে। তাই প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক চর্চায় অংশ নিতে পারে।

 

আরও একটি দিক বিবেচনা করা জরুরি, ছাত্র রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্য। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে, ফলে একটি বড় অংশ প্রতিনিধিত্বহীন থেকে যায়। নারীদের অংশগ্রহণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর, ভিন্নমতের জায়গা; এসব নিশ্চিত না হলে ছাত্র রাজনীতি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে না। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি হতে হলে এটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে সকলের মতামত প্রকাশের সমান সুযোগ থাকবে।

 

এছাড়া, ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্নটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন একজন ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়, তখন সে কেবল নিজের জন্য নয়, বরং একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তার আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং কর্মকাণ্ডের মধ্যে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ থাকা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সহিংসতা; এসব যদি ছাত্র রাজনীতির অংশ হয়ে যায়, তাহলে তা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকালেও দেখা যায়, ছাত্র রাজনীতি একটি গঠনমূলক ও ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলো মূলত নীতিগত বিতর্ক, অধিকার আদায় এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। তারা সহিংসতার পরিবর্তে যুক্তি, গবেষণা এবং সংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে তাদের অবস্থান তুলে ধরে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে, ছাত্র রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত এবং কিভাবে তা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সম্পর্ক। একজন শিক্ষার্থী যখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে, তখন তার রাজনৈতিক অবস্থান ও অংশগ্রহণও প্রভাবিত হয়। তাই একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাত্র রাজনীতিকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করতে পারে। অন্যথায় হতাশা ও বঞ্চনা থেকে জন্ম নিতে পারে নেতিবাচক প্রবণতা।

 

সবকিছুর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চান, কারণ তারা এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়, কিন্তু এর সমাধান রাজনীতি থেকে দূরে রাখা নয়; বরং নিরাপদ, সুস্থ ও মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। তখনই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের রাজনৈতিক চর্চাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারবেন।

 

ছাত্র রাজনীতি কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সম্ভাবনা, যা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে পারে। এটি তরুণদের কণ্ঠস্বর, তাদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিফলন। তাই এটিকে দমন বা উপেক্ষা করার পরিবর্তে আমাদের উচিত এটিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। কারণ আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের নেতা, এবং তাদের হাতেই গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের সমাজ।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!