শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

জিলহজের প্রথম দশক পূণ্য অর্জনের মহিমান্বিত সময়

Author

আজহারুল ইসলাম পিয়াস , Islamic University, Kushtia

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ পাঠ: ১৭ বার

মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট কিছু বিশেষ দিন-রাত রয়েছে, যেগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অত্যধিক। এ সম্পর্কে আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিসে নববীতে সুস্পষ্ট বর্ণনা পাই। বছরের মধ্যে দশটি রাত এবং দশটি দিনকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। তন্মধ্যে দশটি রাত হলো রমজান মাসের শেষ দশ রাত, আর দশটি দিন হলো আশারায়ে জিলহজ্জ তথা জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইসলামী শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইবাদতের মাস হিসেবে এবং আল্লাহর নিকট প্রিয় সময় হিসেবে এই দিনগুলোর ফজিলত জানা ও সে অনুযায়ী আমল করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হিজরি সনের সর্বশেষ মাস জিলহজ্জ, যা পবিত্র হজ্জ ও কুরবানির মাস। এটি হজ্জের তিন মাসের মধ্যে অন্যতম প্রধান মাস। সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াত অনুযায়ী এটি আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাসের একটি। সহিহ বুখারির বর্ণনা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, যেমনটি ছিল আসমান-জমিনের সৃষ্টির সময়। (কারণ, জাহেলী যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমত মাস-বছরের হিসাব কমবেশি ও আগপিছ করে রেখেছিল।) বার মাসে এক বছর, যার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক—জিলকদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম। আরেকটি হলো রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস।’

জিলহজ্জ মাস যেমন হারাম ও সম্মানিত, তেমনি এর প্রথম দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দিনসমূহ। কারণ এ সময়েই রয়েছে ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদ হজ্জের কার্যাবলি, ইয়াওমুল আরাফা অর্থাৎ আরাফার দিন এবং কুরবানির বিধান–যা শা’আইরুল্লাহ বা আল্লাহর নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে সূরা আল-ফজরের প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘শপথ ভোরের, শপথ দশ রজনীর, শপথ জোড় ও বিজোড়ের।’ ভোরের শপথ দ্বারা প্রতিটি দিনের প্রভাতকালকে বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন বহন করে, বিশ্বে আনয়ন করে এক মহাবিপ্লব। আর ‘দশ রজনী’ সম্পর্কে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে উদ্দেশ্য হলো জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। [ইবনে কাসীর]

অন্যদিকে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘দশ বলতে কুরবানির মাসের দশ দিন, জোড় বলতে কুরবানির দিন এবং বিজোড় বলতে আরাফার দিন বোঝানো হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ: ৩/৩২৭, মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/২২০)

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল অন্যান্য সময়ের তুলনায় আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। কারণ এ সময়েই দুটি মহান ইবাদত হজ্জ ও কুরবানি সম্পন্ন হয়, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। আর আরাফার দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়। (সহিহ মুসলিম)

পবিত্র মক্কায় জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের অন্যতম প্রধান রুকন। আর এই আরাফার দিনেই ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি আল্লাহর নিয়ামত সম্পূর্ণ হয়। ১০ তারিখ হলো ঈদুল আজহা বা কুরবানির দিন, যা বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম। এ দিনে হজ্জের অন্যতম প্রধান আমল কুরবানি সম্পন্ন করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঈদের সালাত আদায় ও তাকবির পাঠের পর পশু কুরবানির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

জিলহজ্জের প্রথম দশক ইবাদত, ত্যাগ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহিমান্বিত সময়। এ সময়ে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, আস-সহিহ ২/৮১৯)

এ সময় বেশি বেশি দরুদ, তাকবির ‘আল্লাহু আকবার’, তাহলিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তাহমিদ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও তাসবিহ পাঠেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়া ৯ তারিখ ফজর থেকে তাকবীরে তাশরিক ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একবার উচ্চস্বরে পড়া ওয়াজিব।

সর্বোপরি, এই সময়ের ইবাদত বান্দার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে ক্বলবে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত হৃদয়ের দিকে ধাবিত করে।জিলহজ্জের প্রথম দশক মুসলিম জীবনে ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের এক অনন্য বার্তা নিয়ে আসে। এ সময়ের আমল মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর দিকে আত্মসমর্পণ, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠনের প্রেরণা দেয়। তাই এই মহিমান্বিত দিনগুলোর শিক্ষা ও ফজিলত ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলা।

 

লেখক: সহযোগী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!