চাই দক্ষ জনসম্পদ
বাংলাদেশ জনভারে বিপর্যস্ত। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জন্মসংখ্যা জনশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু দেশের তরুণদের একটি বিরাট অংশ অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত, নেই কোনো কারিগরি দক্ষতা। তরুণরা নিজেরাও জনসংখ্যার ভারে ম্রিয়মাণ দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সচল করার জন্য ভাবছেন। প্রতি বছর ১১ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এ উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উদয়কাঠীকে জানিয়েছেন তাদের ভাবনা।
জনসংখ্যা নয়, প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। সীমিত ভূখণ্ডের বিপরীতে বিপুল জনসংখ্যা যেমন একটি বাস্তবতা, তেমনি এই জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুঃখজনক হলেও সত্য, জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। ফলে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে না।
দেশের অসংখ্য তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। পড়াশোনা শেষ করেও অনেকেই বেকারত্বের দীর্ঘ যন্ত্রণা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এতে যেমন ব্যক্তিগত সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও হারাচ্ছে মূল্যবান মানবসম্পদ।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য— “তরুণদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করা: আজ ও আগামীকালের জন্য”— আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু সনদ নির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষতানির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর ও জীবনমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এই দক্ষ মানবসম্পদ দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনসংখ্যা কোনো বোঝা নয়; সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী নীতির মাধ্যমে এটিই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই এখনই সময় তরুণদের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করার। তাহলেই জনসংখ্যার প্রাচুর্য বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
লেখক,
মোঃ রুহুল আমিন
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
দক্ষ মানবসম্পদই উন্নয়নের শক্তি
জনসংখ্যা একটি দেশের শক্তি তবে সেই জনসংখ্যা যদি দক্ষ, শিক্ষিত ও সচেতন না হয়, তাহলে তা উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ আজ জনমিতিক সুবিধার (Demographic Dividend) এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সুযোগ দেওয়া যায়, তবে তারাই হবে দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। অন্যদিকে, পরিকল্পনাহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বেকারত্ব, পরিবেশের ওপর চাপ এবং সম্পদের অসম বণ্টন আমাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সচেতনতা সৃষ্টি আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পরিবার পরিকল্পনা, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারি। তাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বেশি মানুষ নয়, গড়ে তুলব দক্ষ, সুস্থ, সৃজনশীল ও মানবিক জনগোষ্ঠী।
লেখক,
মোঃ রবিউস সানি জোহা
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফী বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তি ও জনসম্পদে রুপান্তর করা জরুরি
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। কিন্তু সীমিত সম্পদ। বিশাল জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদ দিয়ে কখনো দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকরী উদ্যোগ। যার মাধ্যমে এ বিশাল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করা যাবে। বর্তমান সময়ে এটি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত জনগণ বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সাথে জনগণের বহুমাত্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একটি দেশের সম্পদ কম হলে সেই দেশের বিশাল জনসংখ্যা অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সেই জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে রুপান্তর করা যায়, তাহলে দেশের জন্য অনেক বড় সফলতা। এ জন্য প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে চীন, ভারত বা শ্রীলঙ্কার কথা বলা যেতে পারে, যেখানে সরকার জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করার মাধ্যমে সফলতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও বিশাল জনসংখ্যা। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশের জনগণকে দক্ষ জনশক্তি ও জনসম্পদে রুপান্তর করা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যেমন – বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। তাই কৃষিকে পরিপূর্ণ ভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে। কেননা এদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে, যার সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষিকে আধুনিকায়ন করতে পারলে দেশের দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। মানুষের অভাব দূর হবে। অভাব দূর হলে মানুষ নতুন কিছু চিন্তা করার সুযোগ পাবে। এভাবেই দেশের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার করা। কর্মমুখী শিক্ষা বলতে সেই শিক্ষাকেই বোঝানো হয়, যার মাধ্যমে সহজেই একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বেকার না থেকে কোনো না কোনো কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। তৃতীয়ত, তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক যুগের সাথে সমন্বয় করে চলার জন্য তথ্য প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি বিষয়ে জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। চতুর্থত, নারী শিক্ষার প্রসার বাড়ানো। নারীদের শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সমানভাবে অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে হবে। একসময় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না, বর্তমান সময়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তা প্রদান করা অপরিহার্য। এবং কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করা।
পঞ্চম, শিশুশ্রম বন্ধ করা। শিশুদের সাধারণ ভাবেই বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশু শ্রমিক দিয়ে কখনো দেশের উন্নয়ন হবে না বা দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। বর্তমান শিশুদের দ্বারা অসাধু ব্যক্তিরা বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে। পরবর্তীতে এই শিশুরা বড় হয়ে সহজেই অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত হয়। তাই শিশু শ্রমের সাথে জড়িত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশু যে কাজে পারদর্শী তাকে সেই ধরনের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব।
ষষ্ঠত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিস্তার করা। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মূলত স্ব-কর্মসংস্থান, স্থানীয় কাঁচামাল এবং স্বল্প পুঁজি নির্ভর এমন কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, তাঁত শিল্প, মৃৎশিল্প (মাটির পাত্র), বাঁশ ও বেতের কাজ, নকশিকাঁথা এবং হালকা প্রকৌশল, চাল কল, প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি, হোসিয়ারি শিল্প ইত্যাদি।
সপ্তম, জনগণের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। পুষ্টিকর খাদ্য ও উন্নত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে জনগণকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা।
অষ্টম, শিক্ষার বিস্তার করা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যালয় নেই, আবার কোনো ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যা। কম বয়সেই বই ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া লাগে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর বৃত্তির ব্যবস্থা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বের উন্নত ও প্রযুক্তি-নির্ভর দেশগুলোতে প্রেরণ করা। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সামাজিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। দেশকে এগিয়ে নিতে এসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।
লেখক,
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে গড়তে হবে দক্ষ জনসম্পদ
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে এটি পৃথিবীর ৮ম জনবহুল দেশ। তবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর দুর্নীতি যেন এদেশের অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। অনেকের মতে,
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োজন শিক্ষা। তবে শুধুমাত্র শিক্ষাই এইসমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। চাই শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা (Morality) ও মানবিক মূল্যবোধের (Human Values) চর্চা, যা একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আর শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের মিশেলে যখন এই বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রুপান্তর করা সম্ভব হবে, তখনই বাংলাদেশ সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামগ্রিক উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। তাই এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অঙ্গীকার হোক–কেবল শিক্ষা নয়, বরং নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ দক্ষ জনসম্পদে গড়ে তোলা।
লেখক,
আজহারুল ইসলাম পিয়াস
শিক্ষার্থী, আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
