বাবা আমার জীবনের এক মহাকাব্য
“বাবা: আমার জীবনের নীরব মহাকাব্য”
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
বাবা—এই একটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ, নিঃস্বার্থ ও গভীর ভালোবাসা। যে ভালোবাসা প্রকাশ পায় না বড় বড় কথায়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট ত্যাগে, নীরব দায়িত্ববোধে এবং চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্ত হাসিতে।
আমার বাবাকে আমি কখনো খুব বেশি কথা বলতে দেখিনি। তিনি ছিলেন কম কথা বলা, কিন্তু বেশি কাজ করা একজন মানুষ। তাঁর মুখে হয়তো ভালোবাসার শব্দ খুব কম শোনা যেত, কিন্তু জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনের মুহূর্তে আমি অনুভব করেছি—তিনি ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার আশ্রয়।
ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত যতবারই নতুন বই, খাতা, কলম, জামাকাপড় কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো জিনিসের জন্য বাবার কাছে আবদার করেছি, ততবারই তিনি তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। কখনো সঙ্গে সঙ্গে কিনে দিয়েছেন, কখনো বলেছেন, “পরে দেব।” কিন্তু আর্থিক সংকট থাকলেও কখনো বলেননি, “দিতে পারব না।” ছোটবেলায় বুঝতাম না, সেই বই-খাতা কিংবা পোশাকের পেছনে কত ঘাম, কত ত্যাগ, কত ক্লান্ত দিনের পরিশ্রম লুকিয়ে ছিল। আজ আমি নিজে বাবা হওয়ার পর ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছি—বাবার ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ পায় না; তা দায়িত্বের মাধ্যমে লেখা থাকে।
জীবনের কঠিন সময়গুলোতেও বাবাকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। চারপাশে যখন অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে, তখনও তাঁর চোখে দেখেছি এক অদ্ভুত স্থিরতা। তিনি হয়তো কিছু বলতেন না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতিই যেন আশ্বস্ত করত—“চিন্তা করো না, আমি আছি।”
বাবা আমাকে শুধু ভরণ-পোষণই দেননি, দিয়েছেন জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আমি যেন একগুঁয়ে না হই, সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ না থাকি—সেজন্য তিনি আমাকে বহুমাত্রিক শিক্ষা দিয়েছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন ধারায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন—সততা মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ, পরিশ্রমই তার প্রকৃত পরিচয়, আর ধৈর্য হলো জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। এসব শিক্ষা আমি কোনো বইয়ে পড়িনি; দেখেছি তাঁর প্রতিদিনের জীবনচর্চায়।
আজ বুঝতে পারি, বাবার অনেক কষ্টই ছিল আমাদের অজানা। নিজের ইচ্ছা, নিজের স্বপ্ন এবং ব্যক্তিগত অনেক চাওয়া-পাওয়া তিনি বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য। তাঁর জীবন যেন এক নীরব আত্মত্যাগের মহাকাব্য।
আজও দেখি, দিনের শেষে যখন সূর্য অস্ত যায় এবং ক্লান্তি তাঁকে ঘিরে ধরে, তখন তাঁর মুখের দিকে তাকালে অনেক না-বলা কথা, অনেক অপূর্ণ স্বপ্নের আভাস পাওয়া যায়। তবুও সেখানে বিরাজ করে এক অসাধারণ প্রশান্তি—কারণ তিনি জানেন, তাঁর সন্তানেরা ভালো আছে।
একটি ঘটনার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমি আলিম শ্রেণিতে পড়ি। বাবার সঙ্গে সিএনজিযোগে লক্ষ্মীপুর যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির ছাট যাতে আমার গায়ে না লাগে, সেজন্য বাবা বারবার আমার চারপাশ দেখছিলেন। আমি বারবার বলছিলাম, “বাবা, আমি ভিজছি না।” কিন্তু তিনি নিজ হাতে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হচ্ছিলেন। আজও কোথাও বের হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “কিরে, টাকা আছে তো? আর লাগবে না?” বয়স বাড়লেও বাবার সেই মমতা ও দায়িত্ববোধ একটুও কমেনি।
শুধু আমার প্রতিই নয়, আমার ভাইবোনদের প্রতিও তিনি সমান যত্নশীল। একবার আমার ছোট বোন ও ভগ্নিপতি বড় বোনকে দেখতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হলে বাবার মুখে যে উদ্বেগ দেখেছিলাম, তা কখনো ভোলার নয়। তাঁর চোখ লাল হয়ে উঠেছিল, অশ্রু যেন উপচে পড়ার অপেক্ষায় ছিল। তখন উপলব্ধি করেছি, সন্তানের কষ্ট একজন বাবার হৃদয়কে কত গভীরভাবে নাড়া দেয়।
আমার বাবা সত্যিকার অর্থেই একজন ‘অলরাউন্ডার’। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি আমাকে বাস্তবতার পাঠ শিখিয়ে চলেছেন। তাঁর দৈনন্দিন আচরণ, চলাফেরা ও জীবনযাপন আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি একাধারে শিক্ষক, প্রশাসক, সমাজসেবক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি পরিবারের একজন দায়িত্বশীল ও সক্রিয় সদস্য। তাঁর কর্ম, চরিত্র ও অবদান শুধু আমাদের পরিবার নয়, সমাজের বহু মানুষের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ অর্থে সমাজের অনেক মানুষই তাঁর কাছে ঋণী।
বাবার প্রতি আমার ভালোবাসা কোনো ভাষা, কোনো কবিতা কিংবা কোনো লেখার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবুও এই লেখাটি একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস—একজন সন্তানের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার স্বীকারোক্তি।
বর্তমানে আমার বাবা অসুস্থ। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আন্তরিকভাবে দোয়া করি, তিনি যেন আমার বাবাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করেন, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণময় জীবন দান করেন। আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানী সাগীরা।
“হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।”
সহ সুপার: আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
মুশরিফ : মাহাদুল উলুমিশ শরইয়্যাহ বাংলাদেশ
nazmulislam19122@gmail.com