বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

বন্যায় আমাদের করণীয় ও ইসলামের দিকনির্দেশনা

Author

NAZMUL ISLAM FARUQUE

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪০ বার

বন্যায় আমাদের করণীয় ও ইসলামের দিকনির্দেশনা

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক 

বাংলাদেশের প্রকৃতি যেমন অপরূপ, তেমনি বৈচিত্র্যময়। বর্ষা এ দেশের কৃষি, নদী ও জীববৈচিত্র্যের জন্য আশীর্বাদ হলেও অনেক সময় তা ভয়াবহ বন্যার রূপ ধারণ করে। উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে যখন জনপদ প্লাবিত হয়, তখন অসংখ্য মানুষ গৃহহীন, কর্মহীন ও অসহায় হয়ে পড়ে। এ ধরনের দুর্যোগে মানুষের ঈমান, ধৈর্য, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা হয়। ইসলাম দুর্যোগকে কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা, ধৈর্য ও মানবসেবার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখতে শিক্ষা দেয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে তিনি মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করেন এবং ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। তাই বন্যার সময় হতাশা, অভিযোগ বা নিরাশায় ডুবে না গিয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখা, তওবা-ইস্তিগফার করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা একজন মুমিনের কর্তব্য। একই সঙ্গে বেশি বেশি দোয়া, সালাত ও আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরে শক্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়।

ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির কথাই বলে না; বরং বাস্তব প্রস্তুতিকেও ঈমানের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিক্ষা দিয়েছেন—আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও করবে। তাই বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিশু, নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সরকারি নির্দেশনা ও উদ্ধারকারী সংস্থার পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি বড় কষ্ট দূর করবেন। তাই যার সামর্থ্য আছে, তিনি অর্থ, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক, নৌকা বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবেন। আর যার আর্থিক সামর্থ্য কম, তিনি শ্রম, স্বেচ্ছাসেবা, রক্তদান, উদ্ধারকাজ, তথ্য পৌঁছে দেওয়া কিংবা আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারেন। ইসলামে মানবসেবার মূল্য অত্যন্ত উচ্চ, বিশেষ করে বিপদের সময়।

বন্যাকালে কিছু অসাধু ব্যক্তি ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎ, খাদ্য মজুত, অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। ইসলাম এসব কাজকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করা ঈমান ও নৈতিকতার পরিপন্থী। ত্রাণ বিতরণে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাহায্য করা একজন মুসলমানের আদর্শ হওয়া উচিত।

বন্যার সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ পানি পান করা, খাবার ঢেকে রাখা, হাত পরিষ্কার রাখা, পানিবাহিত রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা জীবন রক্ষার অপরিহার্য অংশ। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সবার উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অন্যদেরও সচেতন করা।

দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে আমাদের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের সহায়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা, গবাদিপশু রক্ষা, বৃক্ষরোপণ, নদী ও খাল সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সমাজে সহযোগিতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হয়।

পরিশেষে বলা যায়, বন্যা মানুষের অসহায়ত্বের স্মারক হলেও এটি মানবতা, ধৈর্য ও ঈমানেরও পরীক্ষা। ইসলামের শিক্ষা হলো—আল্লাহর ওপর ভরসা করা, যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র যদি ইসলামের এই নীতিগুলো অনুসরণ করে, তবে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব হবে। বন্যার অন্ধকারের মধ্যেও তখন জেগে উঠবে সহমর্মিতা, ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির উজ্জ্বল আলো—যা একটি কল্যাণময় ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক

সহ সুপার: আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা

লেখক: সদস্য।
লিংক কপি হয়েছে!