আশুরা: ফজিলত ও প্রাসঙ্গিকতা
আশুরা : ফজিলত ও প্রাসঙ্গিকতা
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
মুহররম ইসলামী হিজরি সনের প্রথম মাস এবং আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত ১২ মাসের অন্যতম। ম আল্লাহ এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২টি। আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দিন থেকেই তা নির্ধারিত। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।’ (সূরা আত-তাওবা-৩৬)
মহররম নামকরণের কারণ: ‘মহররম’ শব্দটি আরবি ‘হারমা’ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো-সম্মানিত, নিষিদ্ধ বা পবিত্র। অর্থ এমন মাস, যা বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং যেখানে কিছু বিষয় নিষিদ্ধ বা সংযত রাখা হয়। জাহেলি যুগেও আরবরা এই মাসকে অত্যন্ত সম্মান করত। তারা বিশ্বাস করত, এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত ও প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলামের আগমনের পর আল্লাহ তায়ালা এই সম্মানকে বহাল রাখেন এবং এটিকে চারটি পবিত্র মাসের অন্তর্ভুক্ত করেন। ইমাম ইবনে কাসির রহ, বলেন, ‘এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহের নিষেধাজ্ঞা ও পবিত্রতার গুরত্বের কারণে এর নাম মহররম রাখা হয়েছে।’ অতএব, মহররম নামটি এ মাসের সম্মান, মর্যাদা এবং পবিত্রতার প্রতীক।
মহররমের ঐতিহাসিক পটভূমি: ইসলামপূর্ব যুগে আরবরা চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিত। এসব মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখা হতো এবং মানুষ নিরাপদে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও ভ্রমণ করতে পারত। তবে তারা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে মাসের ক্রম পরিবর্তন করত, যাকে ‘নাসি’ বলা হতো। ইসলাম এ প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম আগমনের পর মহররমের মর্যাদা আরো সুসংহত হয়। হিজরি সনের প্রবর্তন হয় উমর ইবনুল খাত্তাবের খেলাফতকালে। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ১৭ হিজরিতে ইসলামী বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হয়। ইসলামী বছরের সূচনা হিসেবে মহররমকে নির্ধারণ করা হয়। কারণ হজ সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা ও নতুন বছরের কার্যক্রম সাধারণত মহররম মাস থেকেই শুরু হতো।
মহররমের তাৎপর্য ও ফজিলত: মহররম কেবল একটি মাসের নাম নয়; বরং এটি ইসলামী ঐতিহ্য, আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, ত্যাগ ও আল্লাহর আনুগত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এ মাস মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সময়ের মর্যাদা রক্ষা, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং নেক আমলে অগ্রসর হওয়া ঈমানের দাবির অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘বছর বারো মাসের। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। তিনটি পরপর- জিলকদ, জিলহজ ও মহররম; আরেকটি হলো রজব।’ (বুখারি-৪৬৬২) মহররম মাস ইসলামের ইতিহাস, ইবাদত এবং মুসলিম সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। রাসূলুল্লাহ সা: এ মাসকে (আল্লাহর মাস মহররম) বলে অভিহিত করেছেন, যা অন্য কোনো মাসের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়নি। (মুসলিম-১১৬৩) এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ। বিশেষত প্রথম দশকের রোজাগুলোর প্রতি অনেক আলেম গুরুত্ব দিয়েছেন।
আশুরা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি: মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনে সংঘটিত কিছু ঘটনা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আবার কিছু ঘটনা ইতিহাস ও তাফসির গ্রন্থে উল্লিখিত হলেও সেগুলোর সনদ সহিহ নয়। তাই আশুরা সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে সহিহ ও দুর্বল বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য জানা জরুরি। হজরত মূসা আ: ও বনি ইসরাইলের মুক্তির ঘটনা: আশুরার সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহিহ ঘটনা হলো- আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা আঃ ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন।(বুখারি-২০০৪, মুসলিম-১১৩০)
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা: ৬১ হিজরি সালের ১০ মহররম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) তারিখে ইমাম হুসাইন ইবনে আলী রাঃ ও তাঁর সঙ্গীরা কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন। (তারিখে তাবারি: খণ্ড-৫. পৃষ্ঠা ৩৮৯-৪৬০, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া: খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা ১৫০-২২৫)
অন্যান্য প্রচলিত ঘটনাবলি এ সম্পর্কে বিভিন্ন তাফসির, ইতিহাস ও ওয়াজ-নসিহতে আরো অনেক ঘটনা পাওয়া যায় যেগুলোকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়; বরং কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- হজরত আদম আ:-এর তাওবা কবুল, হজরত নূহ আ:-এর নৌকা জুদি পর্বতে ভিড়া, হজরত ইবরাহিম আ:-এর অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি, হজরত ইউনুস আ:-এর মাছের পেট থেকে মুক্তি, হজরত আইয়ুব আ:-এর রোগমুক্তি ও হজরত ইউসুফ আ:-এর কূপ থেকে উদ্ধারের ঘটনা ইত্যাদি। (লাতায়িফুল মায়ারিফ, পৃষ্ঠা ১০৪-১০৭, তাফসির ইবনে কাসির, সূরা হুদ, আয়াত-৪৪-এর তাফসির, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা ৩৩৬)
আশুরার ফজিলত:
এক বছরের গুনাহ মাফের সুসংবাদ: রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম-১১৬২) নবী সা:-এর সুন্নত রাসূলুল্লাহ সা: নিজে আশুরার রোজা রেখেছেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারি-২০০৪, মুসলিম-১১৩০)
তাওবা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ: আশুরা মুসলমানদের জন্য তাওবা করার সুযোগ, আত্মসমালোচনার দিন, নতুনভাবে নেক জীবন শুরু করার অনুপ্রেরণা। কৃতজ্ঞতা, তাওবা, ইবাদত এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
লেখক: সহ সুপার- আল ফালাহ দাখিল মাদরাসা, পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী