বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আমরা কি এখনও অন্যের লেন্সে নিজেদের দেখি?

Author

মোঃ তায়ীম খান , Gopalgonj Science and Technology University, Gopalgonj

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ২২৩ বার

শিরোনাম : আমরা কি এখনও অন্যের লেন্সে নিজেদের দেখি?

 

কয়েক বছর আগে একটি জনপ্রিয় হলিউড সিরিজে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শহরকে দেখানো হয়েছিল ধুলোময় রাস্তা, ভিড়ে ঠাসা বাজার, আর “বিশৃঙ্খল কিন্তু রঙিন” এক জনপদ হিসেবে যেখানে প্রধান চরিত্ররা পশ্চিমা, আর স্থানীয় মানুষেরা শুধু পটভূমি। এই দৃশ্য নতুন নয়। নেটফ্লিক্স থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত—দক্ষিণ এশিয়া, এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশ, বারবার উপস্থাপিত হয় দারিদ্র্য, বিপর্যয় আর “বহিরাগত বিস্ময়ের” ভাষায়। প্রশ্ন হলো—এই দৃষ্টিভঙ্গি কোথা থেকে আসে, আর আমরা নিজেরা কি এর থেকে মুক্ত?

 

Said-এর তত্ত্ব: জ্ঞান যখন ক্ষমতার হাতিয়ার

 

১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ Orientalism -এ ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তক এডওয়ার্ড সাঈদ একটি সাহসী যুক্তি উপস্থাপন করেন পশ্চিম যাকে “প্রাচ্য” (the Orient) বলে চিনেছে, তা বাস্তব কোনো ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক সত্তা নয়, বরং পশ্চিমা কল্পনা ও ক্ষমতার একটি নির্মাণ। সাঈদের মতে, ঔপনিবেশিক আমলে ইউরোপীয় পণ্ডিত, লেখক ও প্রশাসকরা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যকে এমনভাবে চিত্রিত করেছেন যা পশ্চিমকে যুক্তিবাদী, সভ্য ও আধুনিক হিসেবে আর প্রাচ্যকে রহস্যময়, অযৌক্তিক ও পশ্চাৎপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

 

এই নির্মাণ নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না—এটি ছিল শাসনের একটি হাতিয়ার। যাকে “পশ্চাৎপদ” বলে চিহ্নিত করা যায়, তাকে “সভ্য করার” নামে শাসন করা সহজ হয়ে ওঠে। জ্ঞান আর ক্ষমতা এখানে একে অপরের পরিপূরক—যে বর্ণনা করে, সে নিয়ন্ত্রণও করে। এই কাঠামোতে প্রাচ্যের মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকে না; তাকে সবসময় ব্যাখ্যা করা হয় পশ্চিমা পর্যবেক্ষকের চোখ দিয়ে।

 

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে আজকের বয়ান

 

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এই কাঠামোর প্রভাব গভীর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই এই দৃষ্টিভঙ্গির বীজ ছিল স্থানীয় ভাষা, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চাকে গৌণ করে পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো। স্বাধীনতার পরও এই কাঠামো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি; বরং তা নতুন রূপে ফিরে এসেছে।

 

আজকের “উন্নয়ন বয়ানে” (development discourse) এই প্রবণতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রায়ই উপস্থাপন করা হয় এমন এক জাতি হিসেবে যার “সাহায্য দরকার” বন্যা, দারিদ্র্য, জলবায়ু সংকটের শিকার এক ভূখণ্ড, যার নিজস্ব এজেন্সি বা অর্জন গৌণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা স্থানীয় উদ্ভাবনের গল্পগুলো প্রায়ই চাপা পড়ে যায় “করুণার আখ্যানের” (narrative of pity) নিচে। এই বয়ান পাঠককে সমবেদনা জাগাতে পারে, কিন্তু একই সাথে এক ধরনের অসমতার সম্পর্ক বজায় রাখে যেখানে একপক্ষ সবসময় “দাতা” আর অন্যপক্ষ “গ্রহীতা।”

 

আমরা নিজেরাই কি অংশীদার?

 

কিন্তু এখানেই প্রশ্নটা থেমে থাকে না। সাঈদের তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ হলো “self-Orientalism” যেখানে উপনিবেশিত সমাজ নিজেই পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিজেকে সেই ছাঁচে উপস্থাপন করতে শুরু করে।

 

আমাদের নিজেদের পর্যটন ব্র্যান্ডিং দেখলেই এটা স্পষ্ট হয় “রহস্যময় প্রাচ্য,” “অক্ষত ঐতিহ্যের দেশ” জাতীয় ভাষা ব্যবহার করে আমরা নিজেরাই নিজেদের এক ধরনের প্রদর্শনীর বস্তু বানিয়ে ফেলি, পশ্চিমা পর্যটকের কল্পনার সাথে মিলিয়ে। স্থানীয় এনজিও ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচারণাতেও প্রায়ই একই প্রবণতা দেখা যায়—দুর্ভোগের ছবি, “প্রতিরোধী কিন্তু অসহায়” নারী বা শিশুর প্রতিকৃতি, যা আন্তর্জাতিক অনুদানদাতাদের প্রত্যাশিত আখ্যানের সাথে খাপ খায়।

 

একাডেমিয়াতেও এই প্রবণতা অনুপস্থিত নয়। অনেক সময় আমরা পশ্চিমা তত্ত্বকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করি, নিজেদের সমাজ বিশ্লেষণের জন্য নিজস্ব তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা না করে। এমনকি যে বিতর্ক, সম্মেলন বা মডেল ইউনাইটেড নেশনসের মতো প্ল্যাটফর্মে আমরা অংশ নিই, সেখানেও প্রায়ই পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও যুক্তিধারাকেই “মানদণ্ড” ধরে নেওয়া হয়—নিজেদের প্রেক্ষাপট থেকে বিকল্প কণ্ঠস্বর তৈরির চেষ্টা সেখানে সীমিত থেকে যায়।

 

সমালোচনা ও ভারসাম্য

 

সাঈদের তত্ত্ব নিঃসন্দেহে প্রভাবশালী, কিন্তু সমালোচনাহীন নয়। বার্নার্ড লুইসের মতো ঐতিহাসিকরা যুক্তি দিয়েছেন যে সাঈদ পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ্যাকে অতিরিক্ত সরলীকৃত ও একপেশেভাবে উপস্থাপন করেছেন, এবং প্রাচ্য সম্পর্কে পশ্চিমা পণ্ডিতদের প্রকৃত গবেষণা ও অবদানকে অবমূল্যায়ন করেছেন। ইবনে ওয়াররাকের মতো সমালোচকরা যুক্তি দেন, সাঈদ পশ্চিম ও প্রাচ্যের সম্পর্ককে অতিরিক্ত সরলীকৃত করে উপস্থাপন করেছেন, এবং এই দ্বিবিভাজনে প্রাচ্যের নিজস্ব ইতিহাসে ঘটে যাওয়া দ্বন্দ্ব ও জটিলতাকে উপেক্ষা করে পশ্চিমকেই একতরফাভাবে দায়ী করেছেন যা প্রকৃত জ্ঞানচর্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

 

এই সমালোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিটি পশ্চিমা লেখক বা প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখা, কিংবা সব সমালোচনাকে “প্রাচ্যবাদ” বলে খারিজ করে দেওয়া, নিজেই একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রকৃত কাজ হলো ভারসাম্য বজায় রাখা—পশ্চিমা জ্ঞানচর্চার মূল্যবান অবদানকে স্বীকার করেও, তার মধ্যে লুকানো ক্ষমতা-কাঠামো ও পক্ষপাতকে চিহ্নিত করার সক্ষমতা অর্জন করা।

 

নিজের গল্প নিজে বলার দায়!

 

প্রাচ্যবাদ মূলত একটি প্রশ্ন তোলে-কে বলছে, আর কার পক্ষ থেকে বলছে? বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের গল্প যদি বারবার অন্যের ভাষায়, অন্যের কাঠামোয় বলা হতে থাকে, তাহলে আমরা নিজেদের পরিচয়ের মালিকানা হারাতে থাকি। এই সংকট থেকে মুক্তির পথ একটাই—নিজস্ব কণ্ঠস্বরে, নিজস্ব জটিলতা ও বৈপরীত্য সমেত নিজেদের গল্প বলার সাহস অর্জন করা।

 

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায় আমরা কি সত্যিই নিজেদের গল্প বলতে শিখেছি, নাকি এখনও, অজান্তেই, অন্যের লেন্সে নিজেদের দেখে চলেছি?

 

মোঃ তায়ীম খান

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: ছাত্র, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!