বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিলুপ্ত প্রায় ‘শেরশাহ সড়ক’ এর খোঁজে…

Author

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (কুষ্টিয়া-৭০০৩)

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২১ পাঠ: ৪৩ বার

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ 
সড়ক-ই-আজম বা শেরশাহ সড়ক। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে সোনারগাঁও হয়ে ফরিদপুর, মাগুরা, যশোর এর উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ারের উপর দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কিলোমিটারের এক দীর্ঘ সড়ক পথ। যা নির্মাণ করেন উপমহাদেশে আফগান সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সুরি। রাস্তাটি এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘতম সড়ক পথ। সড়কটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলার পূর্বে এই সড়ক নির্মাণের মহানায়ক এবং সড়কের পূর্বের অবস্থা জানতে পাঠকদের সাথে একটুখানি ইতিহাসের রাজ্যে উঁকি দিতে চাই।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, শেরশাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং দিল্লি সিংহাসনের অধিপতি। তিনি প্রথমে ছিলেন বিহারের সুলতান বাহার খান লোহানীর একজন রাজকর্মচারী। বাহার খানের মৃত্যুর পরে তাঁর নাবালক পুত্র জালাল খান উত্তরাধিকারসূত্রে বিহারের সিংহাসনে বসেন। এসময় শের খান (তখনো তিনি ‘শাহ’ উপাধি ধারণ করেন নি) বিহারের নাবালক সুলতান জালাল খানের নায়েব তথা অভিভাবক নিযুক্ত হন। এসময় ধীরেধীরে সৈন্যবাহিনীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে শের খান বিহারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। নামমাত্র সুলতান জালাল খান শের খানের অভিভাবকত্ব থেকে মুক্ত হতে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু ১৫৩৪ সালে সুরুজগড়ের যুদ্ধে বাংলা ও বিহারের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে শের খান বিহারের সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ১৫৩৭ সালে শের খান বাংলা অধিকারের জন্য গৌড় অবরোধ করেন। একই সময়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন তার বিরুদ্ধে বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হলে শের খান বাংলা ত্যাগ করেন।  এসময় মুঘল সম্রাট আগ্রায় প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন এবং পথিমধ্যে বক্সারের কাছাকাছি স্থান চৌসায় ১৫৩৯ সালে শের খানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শের খান বাংলা, বিহার ও আসামের বিস্তৃত অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার করেন এবং ‘শের শাহ’ উপাধি গ্রহণ করে নিজনামে মুদ্রা জারি করেন। এর পরের বছর ১৫৪০ সালে পুনরায় সম্রাট হুমায়ুন শের শাহের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে কনৌজের নিকটস্থ বিলগ্রামের যুদ্ধে হুমায়ুনকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে শের শাহ দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।
শের শাহের স্বল্প দীর্ঘ শাসনামলে জনকল্যাণমুখী অসংখ্য কর্মের মধ্যে এক অমর কীর্তি হচ্ছে এই সড়ক-ই-আজম বা শের শাহ সড়ক। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কাল থেকেই গঙ্গার মুখ থেকে সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত প্রাচীন একটি রাস্তা ছিল। রাস্তাটিকে ব্যাকরণবিদ পাণিনি ‘উত্তর পথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পরবর্তীতে সম্রাট অশোক এই রাস্তার পুনঃনির্মাণ করেন। এরপরে শের শাহের শাসনামলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে একেবারে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত রাস্তাটির সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক সংস্কার করা হয়। এসময়েই ‘শের শাহ সড়ক’ নামে রাস্তাটির নামকরণ করা হয়। যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক সড়কটির সংস্কার করেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে উত্তর ভারতে এই সড়কের দূরত্ব পরিমাপের জন্য দুই মাইল পরপর ‘কস মিনার’ নির্মাণ করা হয়। সেসময়ে সড়কটি চিহ্নিত করা হয় সারাক-ই-আজম/ শাহ রাহ-ই- আজম বা বাদশাহী সড়ক নামে। সর্বশেষ বৃটিশ শাসনামলে ১৮৩৩-১৮৬০ সালের মধ্যে এই সড়কের সংস্কার করে ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নামে নামকরণ করা হয়।
শের শাহ কতৃক এই দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিলো প্রশাসনিক কাজের গতিবৃদ্ধি করা। পাশাপাশি সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিক সামনে রেখে আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা। শের শাহের শাসনামলে এটিই ছিলো প্রধান সড়ক। সড়কটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বহু নগর, জনপদ, বাজার ও ব্যবসাকেন্দ্র । এই সড়কের দুইধারে তিনি ছায়া দানকারী বৃক্ষ রোপন করেন। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর স্থাপন করেন সরাইখানা। সরাইখানা গুলো পথিকের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার হওয়ার পাশাপাশি  ডাক-চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ চিঠি আদান-প্রদানের কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক থানার কাজ করতো। রাজধানী থেকে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত সরকারি নির্দেশ ও সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য সংবাদ বাহকের ঘোড়া বদলের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো এসব সরাইখানা। মোটকথা, এই সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যের সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপুল উন্নতি সাধন করেন।
বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশগুলোতে গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক এই সড়কের নানা স্মৃতিচিহ্ন। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ অংশে সড়কটির অস্তিত্ব আজ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সোনারগাঁও হয়ে যশোরের বেনাপোল পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশে বিস্তৃত এই সড়কের অস্তিত্ব রয়েছে এখন শুধু যশোরের বাঘারপাড়া এবং মাগুরার শালিখা উপজেলার সামান্য একটু অংশে। ব্যবহৃত হচ্ছে আঞ্চলিক সড়ক হিসাবে। স্মৃতিচিহ্ন বলতে রয়েছে যশোর এবং মাগুরার সীমান্তবর্তী এলাকা দয়রামপুর গ্রামে রাস্তার একটি নামফলক মাত্র। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দয়রামপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার শতপাড়া, শরুশুনা, দেশমুখপাড়া, বুনাগাতী গ্রামের মধ্য দিয়ে মোহাম্মাদপুর উপজেলার নহাটা গ্রাম হয়ে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মধ্য দিয়ে ঢাকার অদুরে সোনারগাঁও অভিমুখে সড়কটির রুট ছিলো। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার হাটখোলাচর গ্রামে এই শেরশাহ সড়কের স্মৃতিচিহ্ন ইট-চুন-সুড়কি নির্মিত অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি সেতু অবশিষ্ট ছিলো। সম্প্রতি উন্নয়নের নামে ভেঙে ফেলা হয়েছে পাঁচশত বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে।
শেরশাহ সড়কের স্মৃতিচিহ্ন অনুসন্ধানে যেয়ে মাগুরার শালিখা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের বর্ষীয়ান আব্দুল খালেক এর সাথে দেখা হয় আমাদের। ওনাকে শের শাহ সড়কের কথা জিজ্ঞাসা করতেই জানান- ‘পাকিস্তান শাসনামল তো বটেই, স্বাধীনতার পরেও  শের শাহ সড়কটি এই অঞ্চলের স্থলপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সড়কের প্রতি ১ কিলোমিটার পর পর ব্রিটিশ শাসনামলে মাইলফলক হিসাবে গোলাকার বিশেষ একপ্রকার পিলার বসানো হয়েছিলো। ম্যাগনেটের গুজবে চোরাকারবারিরা পিলারগুলো তুলে নিয়ে গেছে বেশ কিছুকাল আগেই।’
ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী জাতি হিসাবে আমাদের সুখ্যাতি কোন কালেই খুব একটা ছিল না। বহু ঐতিহ্যবাহী সৌধ, ভবন এবং শিল্পনিদর্শন আমরা নষ্ট করেছি মুনাফামুখী উন্নয়নের নামে। তারই ধারাবাহিকতায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে বোয়ালমারীর হাটখোলাচর গ্রামে অবস্থিত শেরশাহ সড়কের শেষ স্মৃতিচিহ্নটি।
ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে বারবারই আমরা দায়িত্বহীনতা এবং অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছি। নবনির্মাণের আতিশয্যে দূরে ঠেলে দিয়েছি আমাদের ঐতিহ্যকে। অথচ ঐতিহ্যের পুরনো এই স্মারক গুলো বারবার নবায়নের মাধ্যমেই অধিকতর আধুনিক হয়ে উঠতে পারতো।
এই সড়ক নিয়ে শেরশাহের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি বলেছিলেন – “আল্লাহ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে তাহলে আমি এমন একটি মহাসড়ক নির্মাণ করতে চাই যেটা ভারত থেকে খাইবার গিরিপথ পাড়ি দিয়ে একেবারে আরব দেশের মক্কা নগরে গিয়ে শেষ হবে। যাতে করে আমার মা-বোনেরা নিরাপদে নিজেরাই হেঁটে হেঁটে হজ করতে যেতে পারে।” কিন্তু তার সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করে যেতে পারেননি। কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে একটি গোলা দুর্গের দরজায় আঘাত পেয়ে প্রতিহত হয়ে শেরশাহ কে আঘাত করে। সেই গোলার আঘাতেই মৃত্যুবরণ করেন অসামান্য সমরকুশলী এই শাসক।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ আগস্ট ২০২১ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।