বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

টাকার ছবিতে বাংলার সমাজ সংস্কৃতি

Author

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (কুষ্টিয়া-৭০০৩)

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫ পাঠ: ৪২ বার

বাংলাদেশের কাগুজে মুদ্রা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়, এটি দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের এক স্বচ্ছ দর্পণ। প্রতিটি নোটে উঠে এসেছে বাংলার ইতিহাস, প্রকৃতি, কৃষি, স্থাপত্য, পশুপাখি, পরিবেশ ও জীবনধারার জীবন্ত চিত্র। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ থেকে শুরু করে সুন্দরবন, চা বাগান, শাপলা ফুল, দোয়েল পাখি, অসংখ্য পুরাকীর্তি সহ আমাদের ঐতিহ্যগত নানান দিক। টাকায় অঙ্কিত ছবির আলোকে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছেন– এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ 
 
ত্যাগ ও সংগ্রামের গৌরবময় প্রতিচ্ছবি
ভাষা আন্দোলন: বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন; যার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত রচিত হয়। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২ টাকার নোটে শহীদ মিনারের ছবি সংযোজন করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ টাকা অভিহিত মূল্যে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণ মুদ্রা (স্মারক) ইস্যু করে। যার একপাশে স্থান পায় শহীদ মিনার। পরবর্তীতে ১০০০ টাকার প্রচলিত নোটেও শহীদ মিনারের ছবি স্থান পেয়েছে। তাছাড়া ২০১২ সালে ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ৬০ টাকার একটি স্মারক নোটের মূখ্যপিঠে শহীদ মিনার এবং গৌণ পিঠে পাঁচ ভাষা শহীদের আবক্ষ প্রতিকৃতি, বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার এবং ফাগুনের প্রতীক শিমুল ফুলের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যা আমাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা: মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। যার প্রতিফলন ঘটেছে টাকার নকশাতেও। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১ টাকা নোট বাদে প্রচলিত সকল কাগজি নোট, নানাবিধ স্মারক নোট এবং একাধিক স্মারক ধাতব মুদ্রায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিচিত্র সংযোজিত হয়েছে। এছাড়াও এসব স্মারক মুদ্রার নকশায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মুহুর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাস, যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিকৃতি,  ৭ মার্চের ভাষণ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। নিঃসন্দেহে যা আমাদের স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাসকে চিত্রিত করে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিফলন
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি। গ্রামীণ অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাগুজে মুদ্রায় বাংলার কৃষি তথা ধান, চা, পাট, পান পাতা, বাঁশঝাড়ের মতো উপাদান স্থান পেয়েছে। অর্থনীতির প্রাণ বোঝাতে মুদ্রায় অঙ্কিত হয়েছে কৃষকের লাঙল আর কারখানার চাকার ছবি। কোন মুদ্রার গায়ে ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করার প্রতীক। ছিল কবুতর, মাছ, মুরগি, ডিম, আনারস আর কলার মতো পুষ্টিকর খাদ্যপণ্যের ছবিও।
ধানক্ষেত ও কৃষক: ধান বাংলাদেশের প্রধান ফসল। প্রধান খাদ্য হিসেবে, কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে ধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সবুজ ১০ টাকার নোটের একপাশে ‘মাঠে কৃষকের ধান কাটার ছবি’, ১৯৭৬ সালে ইস্যু করা গোলাপি রঙা ১০ টাকা নোটের সামনের দিকে ধানের শীষ এবং পেছনের দিকে ধান কাটার ছবি, ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ১ টাকার নোটে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধানের ছড়া, ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মত ইস্যু করা ৫০০ টাকা নোটের সম্মুখ দিকে ঠিক মাঝখানে কৃষকের মুষ্টিবদ্ধ হাতে কাস্তে আর ধানের শীষ, ২০১১ সালে প্রকাশিত ৫০০ টাকার নোটের উল্টোপাশে ‘ফসলের ক্ষেত, গরু ও লাঙ্গলের সাহায্যে কৃষকের জমি চাষের দৃশ্য’ এবং ২০১২ সালে প্রচারিত ৫০ টাকার নোটে ‘গরুর সাহায্যে মই দিয়ে মাটি সমান করে ফসল রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করার ছবি’ ; ১৯৭৩ ও ৭৭ সালের ৫ পয়সা এবং ১৯৭৪ সালে ইস্যু করা ১০ পয়সায় লাঙ্গল আর ট্রাক্টরের প্রতিকৃতি আমাদের কৃষিনির্ভর সমাজের পরিচয় বহন করে এবং কৃষি অর্থনীতির গুরুত্ব নির্দেশ করে। দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, যা এসকল টাকায় অঙ্কিত ছবির মাধ্যমে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
পাট ও পাটের শিকা: একসময় পাট ছিল বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। ১৯৭২ ও ৭৬ সালে ইস্যু করা ১০০ টাকার নোটের গৌণ পাশে এবং ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ২০ টাকার নোট এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে ইস্যু করা ২০০ টাকা নোটের পেছনের দিকে কৃষকের নদীতে পাট ধোয়া, নদীর পাড়ে পাটক্ষেত ও নৌকায় পাট বোঝাইয়ের দৃশ্য সেকথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এছাড়াও ১৯৭২ সালে ইস্যু করা লালরঙা পাঁচ টাকার নোটের উল্টো দিকে শিল্পাঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বাম  দিকে স্থান পায় ২টি পাট গাছের প্রতিচিত্র। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৫ বার পাঁচ টাকা নোটের রঙ ও নকশায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হলেও প্রতিবারই পেছনপাশের নকশা ‘৭২ সালের আদলে স্থির রাখা হয়। যেখানে  ক্রমবর্ধমান দুটি সতেজ পাটগাছের আঁকা ছবি বহাল থাকে।  ১৯৭৩ সালে ইস্যু করা ৫ টাকা নোটের বিপরীত পাশে পাটের তৈরি  ‘শিকা’র ছবি বাংলার চিরায়ত লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য বহন করে।
চা শিল্প: বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হলো চা শিল্প। চা বাগানের বিস্তীর্ণ ভূমি, চা শ্রমিকদের জীবন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ  অংশীদার। ১৯৭৬ ও ৭৯ সালে প্রকাশিত ৫০ টাকা মূল্যের কাগুজে নোটের উল্টো পিঠে চা বাগান ও বাগান থেকে কুড়ি পাতা সংগ্রহের ছবি সংযোজনের মধ্য দিয়ে সেটাই উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাঁশঝাড়: বাঁশ একটি অর্থকরী উদ্ভিদ। যা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘরবাড়ি নির্মাণ, হস্তশিল্প ও কৃষিকাজে বাঁশের ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যায়।  ১৯৭৩ সালে ইস্যু করা ৫ টাকার নোটের বিপরীত পাশের নকশায় বাঁশঝাড়ের প্রতিচিত্র উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মূলত বাংলার প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকেই তুলে ধরা হয়েছে।
পান পাতা: পান নিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস অনেক পুরনো। বিয়ে বাড়ি কিংবা বিয়াই বেয়ানদের জন্য পান সুপারি নেওয়া বাঙালি সমাজের এক ঐতিহাসিক রেওয়াজ। বিয়ে বাড়িতে পান সুপারী না নেওয়ায় অনেক বিয়ে ভাঙ্গনের ঘটনাও এক সময় ঘটেছে। পানকে বলা হয় ‘ক্যাশ ক্রপ’ বা  অর্থকরী ফসল। আর কৃষকরা পানের বরজকে বলে থাকেন ‘ক্যাশ ব্যাংক’। যখন প্রয়োজন হয় তারা বরজ থেকে পানপাতা তুলে সরাসরি বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন। প্রতিবছর শুধু রাজশাহীতে উৎপাদিত পানের বাজার মূল্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা! গত অর্থবছরের নয় মাসে (জুলাই- মার্চ) পান রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার। জিআই পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে রাজশাহীর মিষ্টি পান। ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণেই বাংলাদেশের টাকায় বহু আগেই স্থান পেয়েছে পান পাতার নকশা। সর্বপ্রথম ১৯৭৩ সালে ইস্যু করা দশ টাকার নোটের সামনের দিকে চারপাশে দুইটি করে মোট আটটি পান পাতা অঙ্কিত হয়। একই সালে ১০ পয়সার মুদ্রার বিপরীত প্রান্তে পান পাতার প্রতিকৃতি স্থান পায়। পরবর্তীতে রং ও সম্মুখভাগের নকশায় আমূল পরিবর্তন এনে ১৯৭৬ এবং ১৯৭৮ সালে  নতুন করে দশ টাকার নোট বাজারে ছাড়া হয়। ১৯৭৩ সালের নোটের আদলে এই নোট দুটিতেও পূর্বের স্থানে থেকে যায় আটটি পান পাতার চিত্র।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ
নৌকা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং সংস্কৃতিরও অংশ বটে। ১৯৭২ সালে ইস্যু করা ১০ ও ১০০ টাকার নোট এবং ২০২০ সালে ইস্যু করা ২০০ টাকার নোটের পেছন ভাগে গ্রামবাংলার বহমান নদী ও নদী পাড়ের দৃশ্য, বহমান নদীর বুকে পাল তোলা নৌকার প্রতিচিত্র অঙ্কিত হয়। এছাড়াও ১৯৭৪, ৭৬, ৭৮ এবং ২০০৬ সালে পর্যায়ক্রমে প্রচারিত ৫ টাকার নোটের পেছনের দিকে নদীতে পাল তোলা নৌকা এবং নদীর তীরে কলকারখানার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একই সাথে ২০১১ সালে প্রকাশিত ৫০০ টাকার নোটে নদীর তীর ধরে গ্রাম্য মানুষের ‘পলো’ দিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার চিত্র বাংলার নদীমাতৃক পরিচয় বহন করে।
মাছে ভাতে বাঙালি
বহুল প্রচলিত প্রবাদটির প্রতিফলন ঘটেছে এদেশের টাকার নকশাতেও। ১৯৭৩ সালে ইস্যু করা ২৫ পয়সায় এদেশের অন্যতম ঐতিহ্য জাতীয় মাছ ইলিশ চিত্রিত হয়। ১৯৭৪ সালে ইস্যু করা নতুন ডিজাইনের ২৫ পয়সায় স্থান পায় রুই মাছের প্রতিকৃতি। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে নতুন নকশার ৫০ পয়সার ধাতব মুদ্রা বাজারে আসে। মুদ্রাটির একপাশে মুরগী, কলা ও আনারসের সাথে পুনরায় উপস্থাপিত হয় ইলিশ মাছ। এছাড়াও ১৯৭৬ ও ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ৫০ টাকা নোটের গৌণ দিকের নকশায় মাঝ বরাবর একদম নীচের দিকে মূল্যমান এর পাশে হাতে আঁকা মাছের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে।
জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির অনুরণন
নানা সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মূল্যমানের টাকায় জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি ভিন্ন আঙ্গিকে সূচিবদ্ধ হয়েছে। মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের বিলুপ্তপ্রায় অথবা একটি নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় প্রাপ্ত বন্যপ্রাণীর ছবি টাকায় প্রদর্শন সংশ্লিষ্ট জাতির ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার স্মারক হিসেবে কাজ করে। এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তায় গুরুত্বারোপ করে।
সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার: ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখচ্ছবি মোটা দাগে সকল ব্যাংক নোটের জলছাপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বাজারে ছাড়া ২৫ পয়সার মুদ্রার বিপরীত প্রান্তে রয়েল বেঙ্গল টাগারের মুখের প্রতিকৃতি স্থান পায়। সর্বশেষ ২০২০ সালে প্রকাশিত ১০০ টাকার স্মারক নোটের গৌণ পিঠে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সহ সুন্দরবনের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
হরিণ: ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ চিত্রা হরিণের উপস্থিতি ছিলো ১ টাকার কাগজি নোটের নকশায়। ১৯৯৩ সালে ‘বিপন্ন প্রানী জগৎ’ উল্লেখ করে ১ টাকা অভিহিত মূল্যের রুপার স্মারক  মুদ্রা ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার একপাশে স্থান পায় জোড়া হরিণের প্রতিকৃতি। এর ঠিক ২০ বছর পরে ২০১৩ সালে ‘দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ২৫ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটের মূখ্যদিকেও লক্ষ্য করা গেছে তিনটি চিত্রা হরিণের ছবি।
দোয়েল পাখি: দোয়েল বাংলাদেশে জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃত। প্রথমবারের মত ১৯৮৮ সালে ২ টাকার নোটের বিপরীত পিঠে উপস্থাপিত হয় বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। পরবর্তীতে ২০০০ সালে বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথমবারের মত ১০ টাকা মূল্যমানের পলিমার ব্যাংক নোট ছাপিয়ে আনা হয়৷ নোটটির মূখ্যদিকের নকশায় সর্ব ডানে ক্ষুদ্রাকৃতির দোয়েল পাখির প্রতিকৃতি স্থান পায়। ২০০২ সালে পলিমার নোটের নকশা পরিবর্তন করে যে ১০ টাকার নোট ইস্যু করা হয় সেখানেও নোটটির মূখ্যদিকে দোয়েল পাখির উপস্থিতি ছিল। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ‘দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ২৫ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটের মূখ্যদিকেও লক্ষ্য করা গেছে দোয়েলপাখির উপস্থিতি।
শাপলা ফুল: শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল; যা আমাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অপরিহার্য প্রতীক। আমাদের দেশের টাকার নকশায় নানাবিধ উপসর্গের সাথে শাপলা ফুলও চিত্রিত হয়েছে নানান সময়ে। এক পয়সা থেকে আরম্ভ করে ৫ টাকা পর্যন্ত প্রায় সকল ধাতব মুদ্রা, বেশ কিছু স্মারক মুদ্রা এবং ১ ও ১০ টাকার কাগজি নোট; যেগুতে জাতীয় প্রতীক সংযোজিত হয়েছে মূল নকশায়। সেখানে রয়েছে পানিতে ভাসমান শাপলা। তাছাড়া আলাদাভাবে সর্বপ্রথম শাপলা ফুলের উপস্থিতি দেখা গেছে ১৯৭২ সালে ইস্যু করা লালরঙা পাঁচ টাকার নোটের সম্মুখ দিকে। পরের বছর ১৯৭৩ সালে ৫ টাকার লাল রঙের আরেকটি নোট বাজারে আসে। সেখানে দেখা যায়, পানি ভর্তি পুকুরে বিকশিত শাপলা শোভা পাচ্ছে। ১৯৭২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ৫ টাকার নোটের নকশা ও রঙ পরিবর্তন হয়েছে।  অন্যান্য নকশা পরিবর্তন হলেও ‘৭২ সালের নোটটির আদলে প্রতিবারই সম্মুখ দিকে মাঝ বরাবর বিকশিত শাপলার অস্ত্বিত্ব টিকে ছিল সগর্বে। ১৯৭৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রথমবার ৫০০ টাকার নোট ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নোটটির জলছাপের নীচে উভয় পাশেই পানিতে ভাসমান প্রস্ফুটিত শাপলা অঙ্কিত হয়। পরবর্তীতে নকশাতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে ১৯৯৮ সালে আরেকটি ৫০০ টাকার নোট ইস্যু হয়। তবে এই নোটটিরও উভয় পাশেই পূর্বের স্থানে শাপলা ফুল থেকে যায়। ২০০০ সালে ইস্যু করা ১০ টাকার পলিমার নোট এবং ২০০২ সালে পরিবর্তিত নকশার ১০ টাকার কাগজি নোটের উভয় পাশেই পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্রাকৃতির শাপলার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
শিক্ষা, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের প্রকাশ
ঐতিহাসিক স্থাপনা: বাংলাদেশের মুদ্রায় দেশের প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে দারুণভাবে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা মসজিদ, লালবাগ কেল্লা, কুসুম্বা মসজিদ, আতিয়া জামে মসজিদ, লালবাগ কেল্লা মসজিদ, বাঘা মসজিদ এবং ষাট গম্বুজ মসজিদ সহ  অনিন্দ্য সুন্দর প্রাচীন স্থাপত্য সমূহ স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের ৫ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত সকল টাকায়।
শিক্ষা: ২০০৪ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ২ টাকার ধাতব মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়। এই মুদ্রার বিপরীতভাগের নকশায় দুটি শিশুর বই পড়ার  চিত্র এবং “সবার জন্য শিক্ষা” স্লোগানটি উদ্ধৃত হয়। দেশের প্রথম ১০০০ টাকার নোটের বিপরীত পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল অঙ্কিত হয়েছে। টাকায় অঙ্কিত এসব ছবি মূলত শিক্ষার গুরুত্ব ও জ্ঞানার্জনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষভাবে শিশু শিক্ষার প্রসার, গণশিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ এবং উচ্চশিক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করে।
শিল্প ও ঐতিহ্য: ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এর ছবি সর্বপ্রথম বাংলাদেশের টাকায় উঠে আসে ২০০০ সালে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ছাপিয়ে আনা ১০ টাকা  মূল্যমানের পলিমার ব্যাংক নোটের সামনের দিকে স্থান পায় এই স্থাপনাটি। পরবর্তীতে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে ইস্যু করা দশ টাকা নোটের পরিবর্তিত নকশাতেও থেকে যায় জাতীয় এই স্থাপনা।
২০১২ সালে বাজারে ছাড়া নতুন ৫০ টাকা নোটের  উল্টোদিকে স্থান পায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ‘মই দেয়া’ বিখ্যাত চিত্রকর্ম।
২০১৩ সালে জাতীয় জাদুঘরের শত বর্ষপূর্তিতে ১০০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোট ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নোটটির মুখ্যদিকে স্থান পায় ১৮ শতকের অশ্বারোহী টেরাকোটা ফলকের ছবি এবং জামদানির নকশা। এবং নোটটির গৌণ দিকে স্থান পায় জাতীয় জাদুঘরের ছবি। ১৯৯৮ সালের একটি স্মারক মুদ্রায় স্থান পায় ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাষ্কর্যটি। এই স্থাপনাগুলোর ছবি টাকায় স্থাপনের মধ্য দিয়ে মূলত বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের প্রতিচিহ্ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
টাকায় নারীর উপস্থিতি
১৯৭৩ সালে ইস্যু করা ১ টাকা নোটের মূখ্য পিঠে একজন সাধারণ বাংলাদেশি নারীর ঢেঁকিতে (উদূখল/ উখলি) ধান ভানার চিত্র; ১৯৭৬ এবং ‘৭৯ সালে ইস্যু করা গভর্ণর নাজিরুদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কমলা রঙের ৫০ টাকা নোটের গৌণ পাশে চা বাগান থেকে নারীদের কুড়ি পাতা সংগ্রহের দৃশ্য; ২৫তম বিশ্ব অলিম্পিক গেমস উপলক্ষে ১৯৯২ সালে ইস্যু করা ১ টাকা অভিহিত মূল্যের স্মারক রুপার মুদ্রার মূখ্য পিঠে নারী অ্যাথলেটের অলিম্পিকের মশাল নিয়ে দৌড়ানোর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। ১৯৯৮ সালে ইস্যুকৃত একটি স্মারক মুদ্রার একপাশে ‘অপরাজেয় বাংলা’র প্রতিচিত্র সংযোজিত হয়েছে; যেখানে নারী প্রতিকৃতি বর্তমান। ২০০৪ সালে ইস্যু করা বাংলাদেশের প্রথম ২টাকা কয়েনের বিপরীতভাগে ছেলে এবং মেয়ে শিশুর বই পড়ার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এসকল সংযোজন সমাজের প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদানকে তুলে ধরে।
জাতীয় সংসদ ও সুপ্রিম কোর্ট ভবন
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের বিমুর্ত প্রতীক হচ্ছে জাতীয় সংসদ এবং সর্বোচ্চ আদালত। প্রথম ১৯৮৭ সালে ইস্যুকৃত ৫০ টাকা নোটের গৌণ পিঠে সংসদ ভবনের ছবি ছাপানো হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের ৫০ টাকার নোট ইস্যু করে ব্যাংক। গভর্ণর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সাক্ষরিত এই নোটটির সম্মুখ পৃষ্ঠে পুনরায় স্থান পায় জাতীয় সংসদ ভবন। এরপর ২০১১ সালে ১০০০ টাকার নোটের বিপরীত পৃষ্ঠেও স্থাপনাটি তুলে ধরা হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশের সংবিধান ও সুপ্রীম কোর্টের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২২ সালে প্রকাশিত ৫০ টাকার স্মারক নোটের মুখ্য পিঠের নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয় সংসদ ভবনের ছবি।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ৫০০ টাকার নোট বাজারে ছাড়া হয় ১৯৭৬ সালে গভর্ণর নাজিরুদ্দিন আহমদ এর স্বাক্ষরে। এই ৫০০ টাকা নোটের পেছনের পিঠে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ভবনের ছবি ব্যবহার করা হয়। এরপর টানা ১২ বছর একই ডিজাইনের নোট প্রচলিত থাকে বাজারে। ১৯৯৮ সালে গভর্ণর লুৎফর রহমান সরকার এর সাক্ষরে সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের ৫০০ টাকার নোট বাজারে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই নোটটিরও গৌণ পাশে সুপ্রীম কোর্ট ভবনের ছবি রাখা হয়। পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০০০, ২০০২ এবং ২০০৪ সালের পরিবর্তিত ৫০০ টাকার নকশাতেও রয়ে যায় সুপ্রীম কোর্ট ভবনের ছবি। ২০২২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান ও সুপ্রীম কোর্টের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে  ইস্যুকৃত ৫০ টাকার স্মারক নোটের নকশাতেও পূর্বোক্ত ধারাবাহিকতা অটুট রেখে  যথাস্থানে বহাল রাখা হয় সুপ্রীম কোর্ট ভবনের প্রমিত চিত্র। টাকায় সংসদ ও সুপ্রীম কোর্ট ভবনের ছবি সংযোজিত করার মধ্য দিয়ে মূলত দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া ভবন দুটি আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীকও বটে।
 
আধুনিক অর্থনীতির অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি 
বাংলাদেশের মুদ্রায় দেশের আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্রও উঠে এসেছে যুগযুগ ধরে। প্রথমবারের মত ১৯৮২ সালে ১০ টাকা নোটে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ছবি সংযোজনের মাধ্যমে দেশের আধুনিক স্থাপনা সমূহ বিশ্বদরবারে উপস্থাপনের প্র‍য়াস করা হয়। এরপর যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পরে ১০০ টাকার নোটে পর্যায়ক্রমে ২০০২, ৩, ৫ এবং ‘৬ সালে ছাপানো হয় সেতুটির ছবি। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার স্মারক হিসেবে ২০১৮ সালে ইস্যু করা ৭০ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ছবি। ২০২২ সালে ১০০ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটে পদ্মা সেতু এবং ৫০ টাকা সমমূল্যের স্মারক নোটে মেট্রোরেলকে উপস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু টানেলও স্থান পেয়েছে ২০২৩ সালের স্মারক নোটে, যা দেশের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির প্রতীক।
এছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিটি ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটেই এসব প্রধান নকশাকে কেন্দ্র করে ফুল, লতাপাতা, মাছ, পাখি, জ্যামিতিক নকশা তথা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী নানাবিধ নকশাও স্থান পেয়েছে। বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, খেলাধুলা, কূটনৈতিক সম্পর্ক—এ সব কিছুও এড়ায়নি বাংলাদেশের টাকার নকশা থেকে।
বাংলাদেশের এসব টাকা কেবল অর্থনৈতিক বিনিময়ের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশ ও জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও অর্থনৈতিক বিবর্তনের জীবন্ত দলিল। সামাজিক জীবনধারার এক বহমান প্রতিচিত্র। প্রতিটি নোট বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের নীরব সাক্ষী। যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের বিবর্তিত সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ (ঈদ সংখ্যা-২০২৫) পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।