বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আমি কৃষ্ণিমা

Author

Tahmida Khanom , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ১২৩ বার


আমি কৃষ্ণিমা—নিশীথের নিস্তব্ধতায় নিবিড় হয়ে থাকা সেই আদিম আঁধার, যার বুকে নক্ষত্রেরা তাদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রাখে। আমি গিলাফে আবৃত কাবার কৃষ্ণবর্ণ- অনুভবের গভীরে প্রোথিত এক অনিবার্য উপস্থিতি। আমার অস্তিত্বের অন্তরালে কোনো কৃত্রিমতার প্রলেপ নেই, কোনো আত্মগোপনের অভিসন্ধি নেই; আমার সমস্ত অনিবার্যতা নিয়েই আমি। অথচ এই পৃথিবীতে আমার পরিচয়ই আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রথম অভিযোগ, আমার গাত্রবর্ণই আমার অস্তিত্বের বিপক্ষে দাখিলকৃত আদিমতম সাক্ষ্য। জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই যেন এক অদৃশ্য বিচারালয়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি—যেখানে অপরাধের সংজ্ঞা আমার অজানা, অথচ দণ্ডাদেশের ভার বহন করে চলেছি প্রতিনিয়ত।

আমি কেশবর্ণের আবরণে কৃষ্ণিমার অনিবার্য উত্তরাধিকার বুকে ধারণ করেই অবগাহন করি সমালোচনার পাথারে। অবজ্ঞার প্রস্তরখণ্ড, বিদ্রূপের বিষাক্ত শলাকা, পরিহাসের তীক্ষ্ণ ফলক—সবকিছুই এসে আঘাত হানে আমার আত্মমর্যাদার প্রাচীরে। কখনো কারও অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে, কখনো ঠোঁটের কোণে জমে থাকা উপহাসে, কখনো-বা অনায়াসে উচ্চারিত কোনো অবমাননাকর বিশেষণে আমার অস্তিত্বকে সংকুচিত করে আনা হয় একটি মাত্র বর্ণের পরিসরে। যেন আমার সমস্ত সত্তা ও মননকে অস্বীকার করে কেবল ত্বকের রঞ্জক পদার্থটুকুই আমার পরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল!

কী বিচিত্র এই সভ্যতার নন্দনতত্ত্ব! যে সমাজ মানুষের আত্মার গভীরতা পরিমাপ করতে অক্ষম, সে-ই তার ত্বকের উপরিতলকে সৌন্দর্যের মানদণ্ডে উন্নীত করেছে। যে দৃষ্টি চরিত্রের ঔজ্জ্বল্য অনুধাবন করতে পারে না, সে দৃষ্টিই গাত্রবর্ণের তারতম্যে নির্মাণ করেছে শ্রেষ্ঠত্ব ও হীনতার কৃত্রিম বিভাজন। আমার দেহ যেন তাদের নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়, আমার অবয়ব যেন তাদের নন্দনবোধের পরীক্ষাগার, আর আমার জীবন যেন তাদের আরোপিত ত্রুটির এক অফুরন্ত আকর। আমার নীরবতা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ, প্রতিবাদ ঔদ্ধত্য; আমার বিনয় দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাস দম্ভ। অর্থাৎ আমার অস্তিত্বের প্রতিটি প্রকাশকেই তারা নিজেদের নির্ধারিত ধারণার অনুকূলে ব্যাখ্যা করে। তারা আমাকে মানুষ হিসেবে না; বরং নিজেদের নির্মিত সৌন্দর্যবোধের সামনে দাঁড় করিয়ে আমার গ্রহণযোগ্যতার বিচার করে।

কিন্তু আমি তো কেবল একটি বর্ণ নই। আমার কৃষ্ণিমার অন্তরালে যে মনন ক্রমাগত পৃথিবীকে পাঠ করে, যে হৃদয় নিঃশব্দে মমতার অনুশীলন করে, যে বিবেক অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে—তার পরিমাপ তোমাদের প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের কোনো দাঁড়িপাল্লায় অসম্ভব। আমার অন্তঃকরণে কত অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাসের স্তর জমে আছে, কত অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা সময়ের নিষ্ঠুর করাঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেছে, কত স্বপ্ন সামাজিক অবজ্ঞার ভারে পল্লবিত হওয়ার আগেই ম্রিয়মাণ হয়েছে—তার কোনো হিসাব তোমাদের কাছে নেই। তোমরা আমার ত্বকের দৃশ্যমান বর্ণটুকু পড়তে পারো, কিন্তু আমার অস্তিত্বের অন্তর্লিখিত পাণ্ডুলিপি পাঠ করার ধৈর্য তোমাদের নেই।

 

আমি জন্মে কৃষ্ণিমা, রৌদ্রের প্রখরতায় কৃষ্ণিমা, গোধূলির আবছায়াতেও কৃষ্ণিমা; সময়ের অনিবার্য ক্ষয়, ঋতুর পর্যায়ক্রমিক আবর্তন কিংবা জীবনের বহুবিধ অভিঘাত আমার জন্মগত পরিচয়কে মোছে না। মৃত্যু যখন আমার পার্থিব অস্তিত্বের সর্বশেষ অধ্যায়ে যবনিকা টানবে, তখনও আমার এই বর্ণ কোনো নৈতিক অপরাধের স্বীকারোক্তি হয়ে উঠবে না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমার বর্ণ অপরিবর্তিতই থাকবে। কিন্তু তোমাদের বিচারবোধ এমনই উপরিতলনির্ভর যে, আমার অর্জিত প্রজ্ঞার চেয়ে অনর্জিত গাত্রবর্ণ, আমার চরিত্রের চেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অবয়ব, আমার মানবিকতার চেয়ে ত্বকের দৃশ্যমান রঞ্জনই তোমাদের কাছে অধিকতর তাৎপর্য বহন করে।

তুমি—শুভ্রতার আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান, বহুবর্ণের প্রসাধনে সজ্জিত, বাহ্যিক ঔজ্জ্বল্যের মোহে আত্মবিস্মৃত এক সত্তা—নিজের প্রতিচ্ছবিকে নানাবিধ অলংকরণে ভূষিত করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলো। প্রসাধনের প্রলেপে, আভিজাত্যের আবরণে, কৃত্রিম জৌলুশের বহিঃপ্রকাশে তুমি নিজের শ্রেষ্ঠত্বের এক অলীক উপাখ্যান রচনা করো। অতঃপর আমার কৃষ্ণিমার দিকে তাকিয়ে এমন এক ব্যবধান কল্পনা করো, যার ভিত্তি প্রকৃতিতে নয়, তোমার মানসিকতার গভীরে প্রোথিত কূসংস্কারে।

কিন্তু একবারও কি আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছ? যে শুভ্রতার অহংকারে তুমি অন্যকে অবমূল্যায়ন করো, তার সঙ্গে তোমার অন্তঃকরণের পবিত্রতার সম্পর্ক কোথায়? ত্বকের ঔজ্জ্বল্য কি বিবেকের নির্মলতার নিশ্চয়তা দেয়? বাহ্যিক বর্ণের সৌকর্য কি চরিত্রের মহত্ত্বের অব্যর্থ প্রমাণ? প্রসাধনের বহুবর্ণ আয়োজন কি হৃদয়ের সংকীর্ণতা আড়াল করতে পারে? যদি না পারে, তবে তোমার এই আত্মম্ভরিতা কিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত—প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে, নাকি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি অনিচ্ছাকৃত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্মিত আত্মপ্রবঞ্চনার মোহে ?

তুমি আমার গাত্রবর্ণে অন্ধকারের প্রতিরূপ খুঁজে পাও, অথচ নিজের চেতনার গভীরে সঞ্চিত বিদ্বেষের কৃষ্ণগহ্বরটি প্রত্যক্ষ করতে অক্ষম। আমার ত্বকের রং তোমার নন্দনবোধকে আহত করে, অথচ অন্যের আত্মমর্যাদাকে ক্ষতবিক্ষত করার মধ্যে তুমি কোনো নৈতিক বিচ্যুতি অনুভব করো না। আমার বাহ্যিক অবয়ব তোমার কাছে সংশোধনযোগ্য ত্রুটি, অথচ তোমার দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা তোমার আত্মসমালোচনার পরিধির বাইরেই থেকে যায়। কী নির্মম পরিহাস—যে মানুষ অন্যের বর্ণকে কেন্দ্র করে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা করে, সে-ই নিজের মানবিকতার দেউলিয়াপনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্বিকার!

 

তুমি কি জানো, অন্ধকারেরও এক নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব আছে? নিশীথের কৃষ্ণিমা ব্যতীত নক্ষত্রের দীপ্তি এত সুস্পষ্ট হয়ে উঠত কি? নিশীথের কৃষ্ণিমাকে নির্বাসিত করে প্রভাতের শুভ্রতাকে একাকী সিংহাসনে বসালে, আলোর ঔজ্জ্বল্যও একসময় হয়ে উঠবে একঘেয়ে দ্যুতির নির্জন কারাগার। চন্দ্রের কলঙ্কও যেন সেই মহাজাগতিক সাক্ষ্য—কৃষ্ণিমার সামান্যতম পরশ ব্যতীত শুভ্রতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতিও কতখানি অসম্পূর্ণ! অতএব, আমাকে মুছে দিয়ে নিজেকে মহিমান্বিত করার যে বাসনা, তা সৌন্দর্যের প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সৌন্দর্যের বহুত্বকে অস্বীকার করার এক আত্মঘাতী ঔদ্ধত্য। প্রকৃতি যেখানে বর্ণের বহুত্বকে অনায়াসে ধারণ করে, সেখানে মানুষ কেন একটি বর্ণকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়? কেন জন্মগত একটি বৈশিষ্ট্য মানুষের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের অলিখিত বিধানে পরিণত হয়?

প্রকৃতি কাউকে শ্রেষ্ঠত্বের শংসাপত্র দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করে না। মানুষ জন্মগ্রহণ করে তার অনিবার্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে; কিন্তু সেই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কে সম্মানিত হবে, কে অবজ্ঞার পাত্র হবে, কে সৌন্দর্যের স্বীকৃতি পাবে আর কে হীনম্মন্যতার ভারে নত হবে—তার অধিকাংশই নির্ধারিত হয় সমাজের নির্মিত ধারণা ও ক্ষমতার কাঠামোয়। অতএব, বর্ণের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের যে দাবি, তা প্রকৃতির বিধান নয়; বরং মানুষেরই নির্মিত এক কৃত্রিম আধিপত্য, যা যুগে যুগে সৌন্দর্যের সংজ্ঞার আড়ালে নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।

তাই আজ আমি আমার কৃষ্ণিমাকে অস্বীকার করব না। তোমাদের স্বীকৃতির বিনিময়ে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। তোমাদের নন্দনবোধের অনুকূলে নিজেকে পুনর্গঠনের কোনো বাধ্যবাধকতা আমি স্বীকার করি না। আমার অস্তিত্ব তোমাদের অনুমোদনের অপেক্ষায় অসম্পূর্ণ নয়; আমার আত্মমর্যাদা তোমাদের প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল নয়। তোমাদের চোখে সুন্দর প্রতিপন্ন হওয়া বা তোমাদের প্রত্যাশা পূরণ করাই আমার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য নয়। আমার জীবনের তাৎপর্য নিহিত আমার কর্মে, আমার চিন্তায়, আমার নৈতিক অবস্থানে, আমার মানবিকতার ব্যাপ্তিতে—তোমাদের আরোপিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় নয়।

 যে দৃষ্টি আমাকে কেবল গাত্রবর্ণে পরিমাপ করে, সেই দৃষ্টির স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও আত্মমর্যাদার অধিকার নিহিত রয়েছে। কারণ, সৌন্দর্য কোনো একক বর্ণের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়; মর্যাদা কোনো বিশেষ অবয়বের উত্তরাধিকার নয়; আর মনুষ্যত্ব এমন কোনো অলংকার নয়, যা বাহ্যিক সাজসজ্জায় ধারণ করা যায়। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ত্বকের উপরিতলে নয়, তার অস্তিত্বের নৈতিক গভীরতায়।

আমি কৃষ্ণিমা—আমাকে আঁধার বলে অভিহিত করার আগে তোমার দৃষ্টির অন্ধকারটুকু চিনে নাও। আমার বর্ণকে কলঙ্ক বলার আগে তোমার বিবেকের দাগগুলো পরখ করে দেখো। কারণ, আমার ত্বকে যে অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি তুমি আবিষ্কার করেছ, তার চেয়েও গভীর অন্ধকার তোমার অন্তঃকরণেই বাস করে।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সাহিত্য বাতায়ন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।