বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা বর্জ্য: নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৫৭ বার

সাবিহা তারান্নুম মিম: মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও সুস্থ বিকাশের লক্ষ্যে অপরিহার্য একটি মৌলিক চাহিদা হল স্বাস্থ্যসেবা। আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বারোপ করে থাকে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু রোগ নিরাময় নিশ্চিতে সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের সার্বিক শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করার লক্ষ্যে প্রয়োগ করে। প্রযুক্তি নির্ভর উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি। পাশাপাশি বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে টিকাদান কর্মসূচি জনস্বাস্থ্য সচেতনতায় অবদান রাখছে। মানুষের সুস্থ বিকাশ ও নিরাপদ জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা বর্জ্যের সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি হলো, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিৎসা বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ। হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসা গবেষণাগার এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত উৎপন্ন হচ্ছে চিকিৎসা বর্জ্য। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন রোগীদের পরীক্ষা, অপারেশন বা অন্যান্য চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়।ফলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা সেবা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্যের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই চিকিৎসা বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। স্যালাইন, সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ, গ্লাভস ল্যাবরেটরির বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ ব্যবহারের পরে এসকল উপকরণ বর্জ্যে পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই চিকিৎসা বর্জ্য বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসা বর্জ্য উন্মুক্ত জায়গায় অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে অপসারণ করলে তা মাটি, পানি ও বায়ুকে দূষিত করছে। প্রাচীনকালে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপায়ে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত হরেক রকম ভেষজ উপকরণ ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হতো। আর সে সকল চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ হওয়ার কারণে চিকিৎসা বর্জ্যের পরিমাণও ছিল কম। তাই সেকালে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই কোন ব্যবস্থা গ্রহণের বা নীতিমালা প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আধুনিকতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ দেশেই চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অগ্রগতির সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রথমবারের মতো সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে। কেননা ইতিহাসে ১৯৮০ এর দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাসপাতালের বর্জ্য থেকে রোগ সংক্রমণ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। ফলে বিশ শতকের শেষাংশে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি পায় চিকিৎসা বর্জ্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতিমালা তুলে ধরেন। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি বিদ্যার অগ্রগতি অবিচ্ছেদ্যভাবে এই বর্জ্যের সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ টন চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে। যার মধ্যে বিপদজনক চিকিৎসা বর্জ্য প্রায় ১২,৪৩৫ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চিকিৎসা বর্জ্যের পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। শুধু ঢাকার হাসপাতালগুলোতে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে আসে, জরিপ করা হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ৭৭.৪% সাধারণ বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু এর মধ্যে ২২.৬% বিপদজনক চিকিৎসা বর্জ্য। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বর্তমানে এই চিকিৎসা বর্জ্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। Transparency International Bangladesh প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এক প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৩ শতাংশ হাসপাতালের এখনো শোধনাগার নেই। বাংলাদেশের হাসপাতালে কার্যকরভাবে চিকিৎসা বর্জ্য প্রক্রিয়া করতে পারে খুব অল্প সংখ্যক হাসপাতাল। এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সাথে মিশিয়ে সংক্রামকের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। সঠিকভাবে হাসপাতালে ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে হাসপাতালের বর্জ্যকে ভিন্ন স্থানে নিরাপদে সরিয়ে রাখার বিষয় সতর্ক থাকতে হবে। পরবর্তীতে সঠিক তদারকের মধ্য দিয়ে অটোক্লেভ বা ইনসিনারেশনের মাধ্যমে এই বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। হাসপাতালে পরিচ্ছন্নকর্মী বা বর্জ্য সংগ্রহকারীরা যাতে সংক্রমণ না হয় তাই ব্যবহৃত সূঁচ বা সিরিঞ্জ অপসারণে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা তা থেকে হেপাটাইটিস বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু সংক্রামকের আশঙ্কা থাকে। এ প্রসঙ্গে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে রোগী এবং সুস্থ মানুষের জীবনে যেন স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না হয় তাই সঠিকভাবে বর্জ্য নিষ্কাশন করতে হবে। যেহেতু চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সাম্প্রতিককালে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের চিকিৎসায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার লক্ষ্যে ২০০৮ সালের বিধিমালার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন বিধিমালা ২০২৫ এর খসড়া বিধিমালা প্রণীত হয়েছে। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর সঠিক প্রয়োগ বাংলাদেশের টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তবেই যে সকল ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায় তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হওয়া যাবে। সেই সাথে প্রকল্পের যথার্থ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে তা একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও সুস্থ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কাজেই হাসপাতালসহ সকল চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম মনিটরিং করতে হবে। সকলের সমবেত উদ্যোগ স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। সচেতনতার মাধ্যমেই চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকি কমিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তোলা যায় সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ।

সাবিহা তারান্নুম মিম
সমাজকর্ম বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ২৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!