নির্বাচন ও দলগুলোর ট্রাম্পকার্ড

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, কে জনমতকে বেশি আকর্ষণ করতে পারবে, কে বেশি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, কে বেশি সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে। এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভোটার সমাজ, অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো, ধ্যানধারণা, সম্ভাব্য জোট, আন্তর্জাতিক দর্শন- সবই এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা যায় প্রতিশ্রুতির ধরণে। বহু দল ভোট চাইতে গিয়ে এমনসব ইশতেহার দেখায় যা গণতান্ত্রিক নীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকে সমস্যাযুক্ত। কেউ ধর্মরক্ষা বা ধর্মীয় পরিচয়কে উত্তেজিত করে ভোট চায়, কেউ জনগণকে নানা সুবিধা- উন্নয়ন, ভাতা, সুবিধা বা ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আকৃষ্ট করে। এই দুই কৌশলকে দেখে মনে হতে পারে দুটো ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র; কিন্তু বাস্তবে এটি একই রাজনৈতিক দর্শনেরই দুই রকম রূপ, প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবতা ছাড়াই ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা।
ধর্মীয় পরিচয়কে উত্তপ্ত করে ভোট আদায়ের চেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন নয়। ভারত-পাকিস্তান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা কখনো প্রচ্ছন্ন, কখনো প্রকট। ধর্ম যেহেতু মানুষের পরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্মানের সঙ্গে যুক্ত, তাই রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ধর্মকে ব্যবহার করলে ভোটার সহজেই আবেগে নড়ে। এক দল যখন বলে ধর্ম সংকটে আছে, তখন অন্য দলও বাধ্য হয় ধর্মের প্রতি নিজস্ব অবস্থানকে জোরদার করে দেখাতে। ফলাফল, নীতিভিত্তিক রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো পিছিয়ে যায়, আর সামনে আসে আবেগ ও ভয়ের মিশ্রণ। কিন্তু ধর্ম ভোটের উপাত্ত নয়; ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও অনুশীলনের জায়গা। যখন সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র বানানো হয়, তখন সমাজে বিভক্তির রসদ তৈরি হয়। ভোটের আগে ধর্মকে সামনে আনা মানে মূলত ভোটারকে যুক্তির জায়গা থেকে আবেগের জায়গায় ঠেলে দেওয়া। যুক্তি ভোটারকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আবেগ শেখায় পক্ষ নিতে। রাজনীতি যখন প্রশ্নবিহীন পক্ষপাত তৈরি করে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হতে শুরু করে।
অন্যদিকে ভোট চাইতে গিয়ে প্রতিশ্রুতির রাজনীতির চর্চা, এটিও একইভাবে সমস্যাসংকুল। নির্বাচনের আগে খাদ্য, ভাতা, নগদ সহায়তা, প্রণোদনা, কৃষি সহায়তা, শিক্ষা ভর্তুকি কিংবা চিকিৎসা সুবিধা- এগুলো শুনলে মনে হয় রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। কিন্তু নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এগুলো আদর্শ কল্যাণনীতির চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে ভোট প্রলোভনের অস্ত্র। রাষ্ট্র যদি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র হতে চায়, তবে তাকে করব্যবস্থা, রাজস্ব আয়, উৎপাদন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, কৃষি-শিল্পের ভারসাম্য, বৈদেশিক বাণিজ্য, শ্রমনীতি এসবের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করতে হয়। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে এগুলো অনুপস্থিত থাকে। দল শুধু চায়, কী দিলে ভোটার তৎক্ষণাৎ সন্তুষ্ট হবে। ভোটারকেও তখন দেখা হয় সচেতন নাগরিক হিসেবে নয়, বরং সুবিধাভোগী বা ভোক্তা হিসেবে।
এই দুই ধরনের রাজনীতি; ধর্মভিত্তিক আবেগরাজনীতি এবং ভর্তুকিভিত্তিক সুবিধারাজনীতি, একটি মৌলিক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে: উভয়ই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবের বাইরে ঠেলে দেয়। দলগুলো জানে নির্বাচনের পরে অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অনেক সুবিধা রাষ্ট্রের বাজেট-সংকটের কারণে অসম্ভব, অনেক ধর্মীয় দাবি সাংবিধানিক বাস্তবতায় মিলবে না। কিন্তু নির্বাচনের আগে এগুলো বললে ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে যখন জবাবদিহির প্রশ্ন আসে, তখন দলগুলো চুপ হয়ে যায়। ভোটারও তখন নিরাশ হয়, হতাশ হয়, গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস হারায়। দীর্ঘ মেয়াদে এই হতাশা রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি করে। মানুষ বিশ্বাস করে সবাই একই, কেউ কথা রাখে না। ফলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়, যা গণতন্ত্রকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে।
এখানে একটি সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, যদি এগুলো এত সমস্যাযুক্ত হয়, তবে ভোটাররা কেন এগুলোতে সাড়া দেয়? এর উত্তর পেতে হলে রাষ্ট্র-সমাজের অর্থনৈতিক অসাম্যকে বোঝা জরুরি। বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী দরিদ্র, নিম্নআয় কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। তাদের জন্য পাঁচশ টাকা, এক কেজি ডাল বা তেল বা হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা- এসব বাস্তব সুবিধা এবং তাৎক্ষণিক উপকার। উন্নয়নের বড় পরিকল্পনা বা রাষ্ট্রচিন্তার দীর্ঘ পথ তাদের কাছে ধোঁয়াশা ও দূরবর্তী। অনিশ্চয়তার সমাজে তাৎক্ষণিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদকে পরাজিত করে। তাই ভোটার সুবিধা নেয়, কারণ ভোট তার সঞ্চিত নিরাপত্তার জায়গা নয়, বরং তাৎক্ষণিক বাঁচার কৌশল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক শিক্ষার দুর্বলতা। রাষ্ট্রচর্চা, সাংবিধানিক ধারণা, অর্থনীতির কাঠামো, নীতি বিশ্লেষণ- এসব বিষয়ে সাধারণত আলোচনা কম। মিডিয়াও রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখায়, নীতি নয়; তাই রাজনৈতিক বিতর্ক আবেগ ও প্রতিপক্ষবিরোধী ঘৃণায় আটকে যায়।
এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি। গণতন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী দল শুধু ক্ষমতা অর্জনের যন্ত্র নয়, বরং চিন্তার উৎস। দল রাষ্ট্রচিন্তার তৈরি করে, ভোটারকে শেখায়, সমাজকে একটি রাজনৈতিক দৃষ্টি দেয়। যখন দল চিন্তাহীনতায় ভোগে বা কৌশলগত প্রতিশ্রুতির রাজনীতিতে আটকে যায়, তখন বিকল্প রাজনীতির পথ রুদ্ধ হয়। রাজনৈতিক আদর্শ, মতাদর্শ ও দর্শনের জায়গা সংকুচিত হয়। রাজনীতি তখন প্রতিশ্রুতির বাজারে পরিণত হয়; যেখানে ধারণা নয়, অফারই প্রধান। এই অফারের রাজনীতির বড় ক্ষতি হয় রাষ্ট্র-যন্ত্রে। কারণ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ভারসাম্য হারায়; আর পূরণ না করলে ভোটারের বিশ্বাস হারায়। দুটি ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র।
দীর্ঘ মেয়াদে নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ডের এই কৌশল রাষ্ট্রচিন্তায় বিপজ্জনক এক হিসাব তৈরি করে। রাষ্ট্র তার প্রকৃত কাঠামোগত সমস্যাগুলো; যেমন : বেকারত্ব, শ্রমনীতি, দুর্নীতি, আর্থিক খাত, শিক্ষা সংস্কার, বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, কৃষিপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নীতি, জলবায়ু ঝুঁকি- এসব প্রশ্নকে আড়ালে রাখে। অথচ এগুলো ছাড়া রাষ্ট্র স্থায়ী হতে পারে না। নির্বাচনের সময় এগুলোর প্রশ্ন না উঠলে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্যই আংশিক হয়ে পড়ে।
আরও একটি দিক আছে, অন্তর্নিহিত নৈতিকতা। রাজনীতিতে নীতি শব্দটি বহু জায়গায় আজ ব্যঙ্গের মতো শোনায়, কিন্তু নীতি ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। নীতি মানে কেবল দাতব্য কাজ নয়; বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহির নীতি। রাজনৈতিক দল যদি জানে যে কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবুও তা বলছে, এটি রাজনৈতিক অসততা। আর অসততা যখন নিয়ম হয়ে যায়, তখন সততা ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ায়। ভোটারও তখন অসততা আশা করে, এবং তা গ্রহণ করতে শেখে। রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামো তখন ক্ষয় হতে শুরু করে। এই ক্ষয় যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর, কারণ তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, গণতন্ত্রকে নামমাত্র কাঠামোতে পরিণত করে, আর সমাজকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
ভোটার সমাজেরও ভূমিকা আছে। ভোটার যদি ভোটের সময় শুধু সুবিধা দেখে, আর রাষ্ট্রচিন্তা না দেখে, তবে সে আসলে নিজের ভবিষ্যৎকে নিজেই সংকুচিত করে। কিন্তু একে কেবল ভোটারের দোষ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ ভোটার শেখে দল থেকে, রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে, মিডিয়া থেকে। রাষ্ট্র যদি যুক্তিকে চর্চা না করে, মিডিয়া যদি উত্তেজনাকে প্রাধান্য দেয়, শিক্ষা যদি নীতি ও রাজনৈতিক চিন্তা না শেখায়, তবে ভোটার কোথা থেকে শিখবে? তাই দল, রাষ্ট্র, মিডিয়া, সমাজ, ভোটার সবাই অংশীদার।
সবশেষে, নির্বাচনের কোলাহলের মধ্যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বাজার ও আবেগের রাজনীতি হয়তো কিছু ভোট আনতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি ক্ষতিকর পথ। গণতন্ত্রের আসল শক্তি থাকে জবাবদিহি, যুক্তি, বিতর্ক ও নীতিতে। ক্ষমতা আসে নির্বাচনে, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে নীতিতে। রাষ্ট্র যদি ট্রাম্পকার্ডের ওপর দাঁড়ায়, তবে নির্বাচনের পরে তা ভেঙে পড়ে। তাই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে দরকার এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত, ধর্ম আবেগ নয়; মানবিকতা ও সহনশীলতার মূল্যবোধ এবং সুবিধা নয়, অধিকার ও ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। না হলে নির্বাচন থেকে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন হবে, রাষ্ট্র পরিবর্তন হবে না; আর সেই স্থিরতার ভেতরেই থাকবে একটি শূন্য গণতন্ত্র।

